Breaking

Tuesday, December 4, 2018

সাত রঙের চা খেতে [ ৩য় পর্ব ]

রেস্টুরেন্টে ফ্রেশ হয়ে উভয় চান্দের গাড়ির সবাই মুরগি দিয়ে প্রস্তুত করা এক প্রকার খিচুড়ি খেলাম। অসাধারণ একটি খিচুড়ি। তার স্বাদ যেন মুখে এখনও লেগে আছে। যাইহোক, নাশতার পর আবারও চান্দের গাড়ি দুইটি দু'উদ্দেশ্যে চলতে লাগে। ছেলেমেয়েদের গ্রুপ হামহাম ঝর্ণায় যাবে। আর আমাদের গ্রুপ চা বাগান, রাবার বাগান, মাধবপুর লেক, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ইত্যাদি অভিমুখে চলতে থাকে।

চান্দের গাড়ির বিশেষ সুবিধা হলো তার ছাদ খুলে ফেলার সুযোগ থাকা। আমাদের এই গাড়িরও ছাদ খুলে ফেলা হয়। ফলে আমরা ছাদের খোলা রডের ফাঁক দিয়ে মুখ বের করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য দেখতে থাকি।

চান্দের গাড়ি এগিয়ে চলছে। শহরের শেষ প্রান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ক্যাম্পের কাছে চলে আসে। বিজিবি ক্যাম্পের পর থেকেই শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি পরিবেশ শুরু । আমাদের চান্দের গাড়ি শহর ছেড়ে এগুতে থাকে। একটু এগুতেই রাস্তার দুই পাশে পাহাড়ের সারি মাথা উঁচু করে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়। আর পাহাড়ের প্রতিটি টিলায় 'চা বাগান' প্রকৃতির সব সৌন্দর্য এক সাথে ঢেলে নিজেদেরকে আমাদের সম্মুখে প্রকাশ করে। চারদিকে ঝুম সবুজ চা বাগান। মাঝখানে পিচঢালা পথ। তার উপর দিয়ে আমাদের চান্দের গাড়ি এগিয়ে চলছে। মন চাইছে এখনই গিয়ে একটু ছুঁয়ে দেখি। চা পাতার ঘ্রাণ নেই। ড্রাইভারকে বললাম গাড়ি থামান। চা বাগানে পদার্পণ করে আসি। ড্রাইভার হেসে দিলো। বললো - সবুর করো বাছা। তারচেয়েও বড় বাগানের কাছে তোমাদের নিয়ে যাচ্ছি। সেখানে ধরে, ছুঁয়ে, যেভাবে ইচ্ছা চা বাগানের সান্নিধ্য গ্রহণ করবে।

গাড়ি এগিয়ে চলছে। গাছগাছালির নিচে চা বাগান, ফাঁকে কাশফুলের সৌন্দর্য - সব মিলিয়ে এক প্রকার রোমাঞ্চকর অবস্থায় এগিয়ে চলছি। অনেকটা পথ আগানোর পর রাস্তা দুই ভাগ হয়ে যায়। এক ভাগ কমলগঞ্জ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের দিকে চলে গেছে। আরেক ভাগ অন্য দিকে। আমরা অন্য পথটাই গ্রহণ করি। তারমধ্য দিয়ে এগুতে থাকি। রাস্তার উভয়পাশের পাহাড়ে আনারস বাগান, লেবু বাগান, চা বাগান ইত্যাদি দেখে দেখে চলতে থাকি। এই পথে কিছুদূর আসার পর একটি পার্কের সামনে এসে চান্দের গাড়ি থামে। পার্কটির নাম "লেমন গার্ডেন"। জিজ্ঞাস করলাম - এতে কি আছে? উত্তর এলো - স্যুইমিং পুল, কয়েকটা বিনোদন রাউটার, লেবু বাগান আর চা বাগান। পার্কের বিবরণ শোনে আমরা হেসে দিলাম। ধুর, এই পার্ক ঘুরে কি লাভ ! স্যুইমিং পুল, রাউটার চড়লে তো ঢাকাই বেস্ট ছিল। এখানে আসতাম না। এসব বাদ দাও। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে এসেছি, তাই দেখাও।

চান্দের গাড়ি আবারও ছেড়ে দিলো। দশ/পনের মিনিট চলার পর "নূরজাহান টি এস্টেট" এর চা বাগানের একাংশে এসে গাড়ি থামলো। গাইডম্যান আমাদেরকে বললো - হ্যাঁ, এবার মনভরে চা বাগান দেখো। আমরা ব্যাগপত্র গাড়িতে রেখে বেরিয়ে পড়লাম। দৌঁড়ে দিয়ে একটা বাগানে ঢুকে পড়লাম। চা পাতায় হাতের স্পর্শ লাগালাম। শিশির ভেজা চা পাতা আমার হাত সিক্ত করে দিলো। এতে কাপড়ও হালকা ভিজে যায়। একটু আগেই বলে এসেছি যে,  মধ্যরাতে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে নেমে শরৎকাল হওয়া সত্ত্বেও আমি কুয়াশার পরশ পেয়েছি। হ্যাঁ, সেই কুয়াশার কারণেই চা পাতা শিশিরবিধৌত হয়ে আছে। আমরা এখন শিশিরস্নাত চা বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অসময়ের এই কুয়াশার শিশিরজলে ভিজতে বেশ লাগছিল।

একটা বাগান ঘুরে রাস্তায় ফিরে এলাম। পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে চা বাগানের আরও গভীর অংশে ঢুকে পড়লাম। আধা ঘণ্টার মত সময় ঘুরেফিরে চান্দের গাড়ির কাছে ফেরত আসলাম। গাড়িটির কাছে রাস্তার অপর পাশে একটি বড় টিলা ছিল। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ছেলেরা তাতে আরোহন করতে শুরু করলো। আজকের এই দিনের শেয়ারিং ট্যুরপার্টনার হিসাবে আমাদেরকেও সাথে আসতে ডাকলো। আমরা ডাকে সাড়া দিয়ে উঁচু পাহাড়ে উঠি। এতো উঁচু ! ওরে বাব্বাহ ! তারপরও চা বাগানে ঘেরা এই পাহাড়টি পরিদর্শন করলাম। অবশেষে চা বাগান ঘুরার পর্ব ইতি টেনে চান্দের গাড়িতে ফিরে এলাম। গাড়ি আমাদের নিয়ে সামনে বাড়তে লাগলো।

আঁকাবাঁকা এই পাহাড়িপথ দেখতে অনেকটা কাশ্মীরের মত লাগছিল। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা কাশ্মীরের কিছু জায়গার সাথে এর অনেক মিল রয়েছে। তাই মনে হচ্ছিল - আমরা 'কাশ্মীর'ই ভ্রমণ করছি। আমরা চান্দের গাড়ির আসনে না বসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কল্পিত কাশ্মীর দেখতে থাকি। গাড়ি খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে। আর আমরা চোখ জুড়িয়ে শ্রীমঙ্গলের 'শ্রী' দেখতে থাকি। বহুপথ এগুনোর পর গাড়ি পিচঢালা পথ ছেড়ে পাহাড়ি কাঁচাপথে ঢুকে পড়ে। তার মধ্য দিয়েও গাড়ির গতি খুব তীব্র গতিতে আগাতে থাকে । হ্যাঁ, এবার কিছু ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। শহর ছাড়ার পর এই প্রথম কয়েকটা ঘরবাড়ি দেখলাম। পেছনে ফেলে আসা পথে শুধু চা বাগান, লেবু বাগান, আনারস বাগান আর নির্জনতাকে পেয়েছিলাম। কোথাও জনবসতি নেই। যেন কোলাহলমুক্ত একেবারে গহীন এক ভুবন। নিস্তব্ধতার এক রাজ্য। এরকম পথে একা আসতে হয়তো আমার সাহসে দিতো না। তবে এখানের স্থানীয় লোকজন অভ্যস্ততার দরুন পারে।

যাইহোক, গাড়ি কাঁচাপথ ছেড়ে আবারও সড়কপথে উঠে। সামনে বাড়তে থাকে। একটু দূরে দূরে এখন দুই-একটা ঘর মাঝেমাঝে দেখা যায়। আবার খোলা মাঠের সাথে সাথে কয়েকটা ধানক্ষেতও নজরে পড়ে । আর চা বাগান তো আছেই। কিছুদূর এগুতে একটা স্কুলের দেখা পাই। এর পাশে একটি মিল ফ্যাক্টরি। ফ্যাক্টরি ভবনের গায়ে লেখা "মাধবপুর চা কারখানা"। এই কারখানাকেও পেছনে ফেলে চান্দের গাড়ি সম্মুখপানে চলতে থাকে। মিনিট পাঁচেক চলার পর একটি চেকপোস্টের মত দেখতে পাই। এখানে একজন লোক বসা। আমাদের গাড়ি দেখে লোকটি দাঁড়ায়। সামনে যাওয়ার জন্য টিকেট কাটতে বলে। গাড়ি প্রতি ৫০ টাকা। কি দরকার ছিল ৫০ টাকার এক টিকেট দিয়ে আটজনকে ঢুকতে দেওয়া?! ফাও ব্যবসা। অবশ্য তার পুরোটাই লাভ।

আমরা টিকেট কেটে গাড়ি নিয়ে সামনে বাড়ি। এটি 'মাধবপুর টি এস্টেট' এর মালিকাধীন ভূখণ্ড। এখান থেকে সামনের সব চা বাগান এই কোম্পানির। আমরা মাধবপুর টি এস্টেট কোম্পানির এই ভূখণ্ডের সড়কপথ দিয়ে আধা কিলোমিটারের মত যাই। এরপর একটা টি স্টল দেখতে পাই। এই বাগানের চা পাতা দিয়ে এখানে চা বানানো হয় বলে তাদের দাবি। অথচ এগুলোও মেশিন জাত করার পর যে পাতা হয়, ঐ পাতা দিয়েই তৈরি। সরাসরি চা বাগান থেকে তুলে আনা পাতা দিয়ে নয়। ফলাফলে এখান সেখান সব সমান।

আমাদের গাড়ি ঐ স্টলের সামনে এসে থামে। এরপর গাড়ি ঢুকার কোন পথ নেই। সড়কপথে দেয়াল দিয়ে গেইট লাগানো। আমরা ঐ গেইট অতিক্রম করে মাধবপুর লেকের দিকে এগুতে লাগলাম। সামনে একটি উঁচু সিঁড়ি। তা বেয়ে উঠলাম। ওয়াও ! চমৎকার ! মনোমুগ্ধকর একটি লেক। তারমধ্যে শাপলা ফুলের ছড়াছড়ি। লেকের চারপাশ পাহাড় বেষ্টিত। পাহাড় আবার চা বাগানে আচ্ছাদিত। লেকের পাড়ে বসার জন্য চেয়ার পাতানো। সব মিলিয়ে মনকাড়া একটি ভূখণ্ড।

আমরা লেকের সীমানায় প্রবেশ করলাম। টাইলসে মোড়ানো সিমেন্টের চেয়ারে বসলাম। কিছুটা সময় চোখ শীতল করে লেকের প্রাকৃতিক নৈসর্গিকতা উপভোগ করলাম। তারপর লেকের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে অনেক দূর পর্যন্ত গেলাম। খুব সতর্কতার সাথে একটি পাহাড়ে আরোহন করলাম। চা বাগানে ঘেরা এই পাহাড়ের চূড়া থেকে শ্রীমঙ্গলের 'মাধবপুর লেক'কে যেন নতুন আরেকরূপে দেখলাম। চূড়ায় দাঁড়িয়ে লেকের বিপরীত দিকে নজর দিলাম। হুম, বিস্তৃত মাঠের ঐ দিকের চা বাগানগুলো যেন পরী রাজ্যের এক একটি অংশ। আল্লাহর এই অপরূপ সৃষ্টি দেখে বিমোহিত হয়ে রইলাম কতক্ষণ।

স্থানীয়  একজন লোককে দেখলাম ঠাণ্ডা পানি আর লেবু নিয়ে আসতে। কৌতুহল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই বললো - লেবুর শরবত বিক্রি করবো। রাশেদ সমসুরে তাল মিলালো - হ্যাঁ ভাই, অনেক গরম পড়ছে। তাড়াতাড়ি শরবত প্রস্তুত করে ফেলো। ততোক্ষণে আমরা ঐদিকটা দেখে আসি। এই বলে আমরা পাহাড়ের আরও চূড়ায় উঠলাম। হেসেখেলে লেক এবং আশেপাশের চা বাগান দেখলাম। পাহাড়ের এই অংশের চূড়ায় টিন দিয়ে তৈরি একটি বিশ্রামের স্থান বানানো হয়েছে। এখানে আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলাম। বিশ্রামাবস্থায় স্থানীয় আরেকজন লোককে তার ছেলেসহ বরফ, পানি এবং লেবু নিয়ে আসতে দেখলাম। কাছে আসার পর বরফ ভেঙ্গে আমাদেরকে তিনগ্লাস শরবত দিতে বললাম।

শরবত বানিয়ে দিলো। গরমের মাঝে লেবুর ঠাণ্ডা শরবত খেয়ে নিজেকে চাঙ্গা মনে হলো। তাই আবারও তিন গ্লাস বানাতে বললাম। বানিয়ে দিলো। খেয়ে তৃপ্ত হলাম। আমাদের অপর পাঁচ সঙ্গী, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ছাত্র, তারাও নাকি একটু আগে পাহাড়ের নিচের চূড়ায় দেখে আসা শরবত বিক্রেতার কাছ থেকে শরবত খেয়েছে এসেছে। ফলে এখন খাবে না।

লেকের পাশের এই পাহাড়ের চূড়ায় অনেক সময় কাটালাম। তারপর আবারও নিচে নেমে এলাম। হেঁটে হেঁটে মাধবপুর লেকের মূল ফটকে চলে আসলাম। একজন স্থানীয় ছেলেকে দেখলাম একটা গাছ লক্ষ করে ঢিল ছুড়ছে। আর গাছ থেকে বরই ফলের মত ছোট ছোট কি যেন পড়ছে। ফলের নাম জিজ্ঞাস করাতে "হরিতকি" - না জানি কি যেন একটা নাম বললো। আমাদেরকেও একটা একটা করে সে ফল দিলো। কামড় দিয়ে খেয়ে পানি পান করে নিতে বললো। এতে নাকি পাহাড়ি জোঁক আমাদের রক্ত খেতে পারবে না। জোঁক শরীরে ধরলেও ছেড়ে দিবে। ফলটি মুখে নিলাম। কামড় দিয়েই ফেলে দিলাম। স্বাদের কথা কি আর বলবো ! এমন বিস্বাদ ফল এই জন্মে দ্বিতীয়টা খাই নি।

মাধবপুর লেক এরিয়া ছেড়ে আমাদের চান্দের গাড়ি পার্কিং করা ঐ চায়ের স্টলটির কাছে আসলাম। রাশেদ এখানের স্টল থেকে চা খেলো। আমি গাড়িতে বসে থাকলাম। গরমের মাঝে আবার গরম খেতে মন চাইলো না। তবে সাত রঙ বা আট রঙের চা যদি এখানে পেতাম, তবে অবশ্যই খেতাম। এই ৭/৮ রঙের চা সবাই বানাতে পারে না। বিশেষ কিছু চা এর দোকান আছে, তারাই পারে। আমাদের গাইডম্যান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে - আমাদেরকে আট রঙের চা এর আবিষ্কারকের দোকানে নিয়ে খাওয়াবে। তাই নিশ্চিন্তে বসে রইলাম।

মাধবপুর টি এস্টেটের নিজস্ব দোকানে চা খাওয়ার পর্ব শেষে চান্দের গাড়ি আবারও ছেড়ে দিলো। আসার সময় যে রাস্তা দিয়ে এসেছি, যাবার সময় ঐ পথ ধরেই এগুচ্ছি। মাধবপুর চা কারখানা পেরিয়ে গাড়ি সামনে অগ্রসর হতে লাগলো। স্কুলটিও পেছনে পড়ে গেলো। ৫/১০ মিনিট চলার পর দেখলাম - একদল মেয়ে সাইকেল চালিয়ে স্কুল থেকে ফিরছে। মেয়েদের দলবেঁধে সাইকেল চালাতে এই প্রথম দেখলাম। কৌতুহলে ফেটে পড়লাম। গাইডম্যানকে এর কারণ জিজ্ঞাস করলাম। তিনি আবারও হাসলেন। উত্তর দিলেন - তাছাড়া কি আর করবে?! কোন যানবাহন তো এখানে নেই। দূরদূরান্ত থেকে এখানের স্কুলে তাদের পড়তে আসতে হয়। ৮/১০ গ্রাম পর পর একটা স্কুল। হেঁটে আসা যাওয়া করা তো সম্ভব না। তাই এই বিকল্প ব্যবস্থা। আহ, কত কষ্টের জীবন তাদের ; এই সব অঞ্চলের মানুষদের। আমরা কত সুখে আছি। আমাদের হাতের নাগালেই দোকানপাট, প্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং কাছের ও দূরদূরান্তের যানবাহন। চাইলে সব সুবিধা ভোগ করতে পারি। আর ওরা ?

♥ [ বাকী অংশ পরবর্তী পর্বে দেখুন ] ♥

No comments:

Post a Comment

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Adbox