Breaking

Sunday, January 20, 2019

জলপ্রপাতের সন্ধানে [ ৩য় পর্ব ]


হোটেলের রুমে বসে হালকা নাশতা করে নিলাম। তারপর প্রস্তুত হয়ে খৈয়াছড়া ঝর্ণার উদ্দেশ্যে রুম ছাড়লাম। নিচে সৌদিয়া হোটেলের রেস্টুরেন্ট থেকে দুপুরের খাবার পার্সেল নিয়ে নিলাম। এরপর সীতাকুণ্ডের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এসে একটি লেগুনায় উঠলাম। লেগুনা প্রায় ৩০/৩৫ মিনিট চলে আমাদেরকে খৈয়াছড়া মহাসড়কে নামিয়ে দেয়। মহাসড়ক থেকে আরেকটি সিএনজি নিয়ে আমরা ঝর্ণার পাহাড়ের পাদদেশে চলে আসলাম।

এখানে একটি দোকান থেকে চারটি সুরক্ষা লাঠি, চার জোড়া পায়ের এংলেট ভাড়া নিলাম। এবারের এই যাত্রাটি চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চেয়ে আরও বেশি দুর্গম। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে মাঝেমাঝে সিঁড়ি ছিল। এখানে সেটাও নেই। সম্পূর্ণ পাহাড়ি দুর্গম পথ। যা আমাদের লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ে কল্পনা করা যায় না। এই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আমরা কাঙ্খিত ঝর্ণার দেখা পাবো। অতি এডভেঞ্চার এবং পায়ে প্রচুর জোর না থাকলে এমন জায়গা দেখার সৌভাগ্য হয় না। এবারের এই আনন্দভ্রমণের ৪ সদস্য তথা আমি, মামুন, আবদুর রহমান এবং মিরাজ প্রত্যেকেই অতি এডভেঞ্চার বলা যায়। যার ফলে আমাদের জন্য ঝর্ণার অনেকগুলো ধাপ দেখার সুযোগ হয়।

সিএনজি থেকে নামার পর লাঠি ও এংলেট ভাড়া করে জুতাগুলো দোকানে রেখে দেই। তারপর এংলেট পায়ে পরে লাঠি হাতে যাত্রা শুরু করি। এবারের এই ঝর্ণা দেখা মিশনে আমাদের সাথে ঢাকা থেকে আসা আরেকটি গ্রুপ যোগ দেয়। কিন্তু তারা আমাদের সাথে হেঁটে কুলিয়ে উঠতে পারে নি।

দোকানটির কাছ থেকে রওয়ানা দিয়ে প্রায় ২০/২৫ মিনিট পাহাড়ের পাদদেশে স্বাভাবিক রাস্তায় হাঁটার পর গিরিপথ শুরু হয়। সেই সাথে পানির বহমান কলধ্বনি। পানিগুলো ঝর্ণা থেকে পড়ে নালার মাধ্যমে বয়ে নীচে চলে যাচ্ছে। এই নালাগুলোর পাশে পিচ্ছিল পথ। যে পথটি লাঠি ভর করে পা টিপেটিপে যেতে হয়। না হয় দুর্ঘটনার সম্ভবনা রয়েছে। আর পাহাড়ি এই গিরিপথের উভয় পাশে উঁচু উঁচু পাহাড়। পাহাড়গুলো যেন পাথর দিয়ে গঠন করা। শক্ত মাটি। লাঠি দিয়ে খোঁচা দিলে পাথরই মনে হয়। মাঝেমধ্যে বড় বড় পাথরও দেখা যায়। এরকম পিচ্ছিল দুর্গম গিরিপথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে খৈয়াছড়া জলপ্রপাতের প্রথম ধাপটিতে আসলাম।

সুবহানাল্লাহ ! কি অপূর্ব আল্লাহর সৃষ্টি ! উচুঁ একটি পাথুরে টিলা থেকে জলধারা অনবরত নিচে পড়ছে। মন চাইলো এখনই গিয়ে ঝর্ণার নীচে দাঁড়িয়ে যাই। মামুন নিষেধ করলো। বললো - এটি হলো খৈয়াছড়া ঝর্ণার প্রথম ধাপ। এরকম আরও অনেক ধাপ আছে। আগে সবগুলো ঘুরে নেই। তারপর গোসল করবো। হুম, সুন্দর প্রস্তাব। স্বাগতম তোমাকে। ও হ্যাঁ, খৈয়াছড়া জলপ্রপাত সম্পর্কে তো বলাই হলো না। এখানের এই ঝর্ণাটি সম্পর্কে নানান মত আছে। কেউ বলেন এটি ৭ ধাপের ঝর্ণা, কেউ বলেন ১০ ধাপের। আরও বেশি মতও আছে। তবে সবগুলো মতের ফলাফল হলো - খৈয়াছড়া জলপ্রপাত আসলে বহু ধাপের। ছোট বড় সবগুলো ধাপ হিসাব করলে ১৫ টিও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে  ৭/৮ টি ধাপ বড়। প্রতিটি ধাপের উচ্চতা এক একটি টিলাসম।

প্রথম ধাপটি মন ভরে দেখলাম। তারপর পরবর্তী ধাপের দিকে এগুতে শুরু করলাম। এবারের যাত্রাপথ ফেলে আসা পথের চেয়ে দ্বিগুণ কষ্টের। এডভেঞ্চার মানুষ না হলে এমন যাত্রা অসম্ভব। এই যাত্রাটি হবে প্রথম ধাপের জলপ্রপাতের পাশ দিয়ে টিলা বেয়ে। যে টিলাটি একেতো খাড়া ; দ্বিতীয়ত উঠার জন্য না আছে সিঁড়ি, না আছে সহজ কোন কাঁচাপথ। গাছের শিকড় ধরে, লাঠির উপর ভর করে, রশির সাহায্যে উপরে উঠতে হয়। আমরা ভয়, উৎকণ্ঠ ও সতর্ক পা ফেলে উপরে উঠতে থাকলাম। কিছুদূর উঠার পর উপরের দিক থেকে আরেকটি পর্যটকদলকে নিচের দিকে নামতে দেখলাম। তারা ভয় দেখিয়ে নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা শোনালো। আমরা শোনে আবারও হাঁটা দিলাম। ঝর্ণার দ্বিতীয় ধাপের কাছে এসে যাত্রা বিরতি দিলাম।

দ্বিতীয় ধাপের এই ঝর্ণাটিও প্রথম ধাপের মত উঁচু টিলা থেকে পড়ছে। তারপর কিছুটা সমতল পথ পাড়ি দিয়ে প্রথম ধাপের জলপ্রপাত দিয়ে নিচে চলে যাচ্ছে। এখানেও কিছুটা সময় কাটালাম। তারপর এভাবে টিলা বেয়ে বেয়ে আটটি ধাপ অতিক্রম করলাম। এবং নবম ধাপের জলপ্রপাতের কাছে গিয়ে ঝর্ণা দেখার মিশনের সমাপ্তি টানলাম। আর উপরে যাওয়া সম্ভব না। পা ফুলে যাবার উপক্রম।

নবম ধাপের এই ঝর্ণাটির কাছে পৌঁছতে বাকী আট ধাপের চেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছিল। অনেক রিস্ক নিতে হয়েছে। এই ধাপটি উঠার পথ আগেরগুলোর চেয়ে বেশি দুর্গম ছিল। পাহাড়ের কিনারায় পিচ্ছিল একটি সরু চিকন পথ। যে পথটির অতিক্রম বড় কলিজা না থাকলে সম্ভব না। আমরা কোন একজনের ব্যবস্থা করে দেয়া রশি বেয়ে, গাছের শিকড় ও লাঠির উপর হাওয়াই ভর করে সে ধাপটির দোরগোড়ায় পৌঁছি। আবদুর রহমান নবম ধাপে পৌঁছে আরও উপরে উঠার সাহস দেখাতে গেলো। আমরা বাকী তিনজন তার সাহসে সাড়া দিলাম না। ফলে আর উপরে যাওয়া হলো না।

নবম ধাপের ঝর্ণার পাশে বসে কিছু সময় বিশ্রাম নিলাম। আমাদের পূর্বে এখানে আসা আরেকটি পর্যটকদলের গোসল করার দৃশ্য দেখলাম। এখানে পৌঁছতে পৌঁছতে আমাদের প্রায় দুই ঘণ্টার মত সময় লেগেছিল। আবার এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল প্রায়। পেটে প্রচুর ক্ষুধা। আমরা সীতাকুণ্ড থেকে এখানে আসার সময় একটি ব্যাগে করে দুপুরের খাবার, পানি এবং কয়েকটি আপেল কমলা এনেছিলাম। তারমধ্যে নবম ধাপের এই ঝর্ণায় পৌঁছতে পৌঁছতে পানি প্রায় শেষ হয়ে যায়। বাকী খাবারগুলো রয়ে যায়। ঐগুলো খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করি। পানির প্রয়োজন ঝর্ণার জলধারা থেকে সেরে নেই। এই প্রথম ঝর্ণার পানি খেলাম। অবশ্য বড় ঝর্ণার সান্নিধ্যেও এসেছি এই প্রথম। সব মিলিয়ে গহীন পাহাড়ি পরিবেশে ঝর্ণার ধারে বসে মধ্যাহ্নভোজনটি অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে।

খাবার গ্রহণ শেষে নবম ধাপের ঝর্ণার নিচে গোসল করার ইচ্ছা পোষণ করলাম। লাঠির সাহায্যে ঝর্ণার কাছে আসতে চাইলাম। পারলাম না। ঝর্ণার পানিগুলো যেখানে পড়ছে, সেখানে বিশাল গর্ত। যার গভীরতা হাতে থাকা লম্বা লাঠিটি দিয়েও অনুমান করতে পারলাম না। ফলে ভয়ে আর এখানে গোসল করা হলো না।

অনেকটা সময় খৈয়াছড়া জলপ্রপাতের নবম ধাপে বসে মজা করলাম। একটি আশ্চার্যের বিষয় হলো - এখানের পানিতে বড় বড় অনেকগুলো চিংড়ির দেখা পাই। অন্য আরেক দলের কয়েকজন পর্যটক এগুলো ধরতে শত চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা তাতে সফল হয় নি।

আমরা আবার নীচে নামা শুরু করলাম। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চেয়ে মনে হলো এখানে নামতে সহজ এবং রোমাঞ্চকর। রশি বেয়ে, গাছের শিকড় ধরে , লাঠির উপর ভর করে ভয়যুক্ত মজা নিয়ে নিচে নামলাম। নামার পথে খৈয়াছড়া জলপ্রপাতের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ ধাপের দেখা পাই। উঠার সময় অন্য পথে চলে গেছিলাম বলে এগুলোর দেখতে পাই নি। ভাগ্য ভালো - এখন দেখা হয়ে গেলো।

এক সময় খৈয়াছড়া জলপ্রপাতের নিচের ধাপটিতে চলে আসলাম। ইচ্ছা ছিল খৈয়াছড়া জলপ্রপাতে জলধারার নিচে দাঁড়িয়ে গোসল করবো। নবম ধাপটিতে গর্তের কারণে করতে পারি নি। প্রথম ধাপে নেমে এসে করবো বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু নামতে নামতে বিকেলের শেষ মুহূর্ত হয়ে যাওয়ায় আর গোসল করলাম না। এসব অঞ্চলে শীত পড়া শুরু হয়ে গেছে। যদিও সারা দেশে এখনও শীতের আগমন ঘটে নি। তারপরও গোসল করি নি। যদি ঠাণ্ডা লেগে যায় ! তবে গোসলের স্বাধ অন্যভাবে মিটিয়েছি।

সীতাকুণ্ডে ফেরার জন্য পুনরায় হাঁটা দিলাম। পুরনো সেই পিচ্ছিল পথ দিয়ে। আগেই বলেছি পথটির পাশে জলপ্রপাতের পানির বহমান নালা আছে। ফেরার পথে ঐ নালাগুলোর একটিতে হাত-মুখ, মাথা-পা ইচ্ছা মত ধুয়ে নিলাম। যাকে বলে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানো। ঠাণ্ডার ভয়ে জলপ্রপাতের নিচে দাঁড়াতে পারি নি তো কি হয়েছে ; এমনিতে জলের ছোঁয়া নিতে অসুবিধা কোথায় ! পানি অনেক ঠাণ্ডা। দিনের এই শেষ মুহূর্তটিতে গোসল করলে সত্যি কাঁপুনি এসে যেতো।

জলপ্রপাত/ঝর্ণার পানির ছোঁয়া নিয়ে আবারও হাঁটা ধরলাম। ফেরার পথে পাহাড়ি গিরিপথটি সন্ধার আগমনী বার্তা স্মরণ করিয়ে দিলো। আমরা হালকা অন্ধকারে গিরিপথটি পাড়ি দিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে চলে আসলাম। এখন পাদদেশ ঘেঁষা একটি বাড়ির উঠান দিয়ে হেঁটে যেতে হবে। এই বাড়িটির এক পাশে পর্যটকদের উদ্দেশ্য করে  তৈরি করা একটি দোকান ; অপর পাশে বাড়ির মালিকের ঘর। বাড়িটি অতিক্রমের সময় মালিকা হাসিমুখে আমাদের ভ্রমণের অনুভূতি জানতে চাইলো। মামুন সংক্ষেপে কিছু কথা বললো।

এবার পাহাড়ের পাদদেশে হাঁটা। পথ যেন শেষ হচ্ছে না। যাবার সময় এতোটা দূরত্ব মনে হয় নি, ফেরার সময় যতটা মনে হচ্ছে। বুঝলাম না এমন ব্যতিক্রম কেন লাগছে ! স্বাভাবিকভাবে যেতে দূরত্ব মনে হয়, আসতে নয়। এবার উল্টোটা হচ্ছে। সম্ভবত ক্লান্ত বলে এমনটা ভাবছি।

অবশেষে যাবার সময় যে দোকানটিতে জুতা রেখে গেছিলাম, তার নিকট পৌঁছলাম। লাঠি ও এংলেট দোকানে জমা দিলাম। জুতা হাতে ঝর্নার পানি থেকে সৃষ্ট দোকানের পাশে থাকা খালসম নালায় নামলাম। ফ্রেশ হয়ে হালকা বিশ্রাম নিলাম। তারপর খৈয়াছড়া মহাসড়কে আসলাম। মহাসড়কের উপর দিয়ে লেগুনা করে সীতাকুণ্ড ফিরে আসলাম। হোটেলে ফিরে বিছানায় শরীরটা ছেড়ে দিলাম। মামুন ও মিরাজ অল্প সময়ে ঘুমিয়ে পড়লো। আবদুর রহমান ও আমি কষ্ট করে কোন রকম জেগে থাকি।

রাত ৮ টার দিকে ঘুমন্ত দুইজনকে জাগিয়ে দিলাম। রুম ছেড়ে নিচতলার রেস্টুরেন্টে নৈশভোজ করলাম। খাবার গ্রহণ শেষে রাতের পরিবেশে সীতাকুণ্ড শহর দেখতে বের হলাম। আমাদের সৌদিয়া হোটেল সীতাকুণ্ড মডেল থানার পাশে অবস্থিত। আমরা ঐ থানার সামনের সড়কে কতক্ষণ হাঁটলাম। তারপর দিক পরিবর্তন করে শহরের আরেক প্রান্তে আসলাম। এভাবে রাতের সীতাকুণ্ড শহর দেখে পুনরায় হোটেলের তৃতীয় তলায় ফিরে এলাম। আমাদের ২০২ নাম্বার রুমে ঢুকে লাইট বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। সারাদিনের ক্লান্তিতে অল্প সময়ে ঘুম চলে আসলো।


[  বাকী অংশ পরবর্তী পর্বে দেখুন  ]

No comments:

Post a Comment

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Adbox