আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের ভাষায় এখন ০৮/০৯/২০১৮ ইং শনিবার। আবার ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী আজকে সন্ধার পর থেকেই ১৪৩৯ হিজরীর জিলহজ্জ মাসের ২৬ তারিখ শুরু হয়ে গেছে। এখন সময় রাত ১ টা ১৬ মিনিট। ট্রেন পাঁচ মিনিটের বিরতি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থানার নোয়াপাড়া রেলস্টেশনে। এখানে এসে জানালার সিটটা আবারও রাশেদ দখল করে নেয়। বলে - পাঁচ মিনিটের কথা বলে এক ঘণ্টারও বেশি জানালার পাশে বসেছিস। এখন ছেড়ে দে। আমি কোন টু শব্দ না করে সিট ছেড়ে দেই। মাঝের সিটে এসে বসি।
হবিগঞ্জ জেলার নোয়াপাড়া স্টেশনে আমাদের ট্রেনের পাশ দিয়ে আরেকটি ট্রেন ক্রসিং করে। এরপর ট্রেন আবারও ছেড়ে দেয়। পাহাড় ঘেঁষা রেলপথ দিয়ে কিছুটা সময় চলি। কয়েক মিনিট পর সড়কপথের দেখা পাই। মহাসড়ক মনে হলো এটি। সড়কের পাশে গ্যাস-তেলের পাম্প এবং কিছু দোকানপাট দেখা যাচ্ছে। আবার আলোকোজ্জল ঘরবাড়িও নজরে পড়তে আরম্ভ করে। হ্যাঁ, ১ টা ৫৩ মিনিটের সময় ট্রেন আরেকটি স্টেশনে প্রবেশ করে। স্টেশনের পরিচয় বোর্ডে স্থানের নাম লেখা "শায়েস্তাগঞ্জ, হবিগঞ্জ"। তারমানে এখনও আমরা হবিগঞ্জ জেলার ভিতরে আছি। শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশনে রেলক্রসিং এর পর ট্রেন আবারও ছেড়ে দেয়।
রাশেদ জানালার পাশে ঘুমানোর চেষ্টা করে। আমি পাশের সিটে বসে অনর্থক চেষ্টা করছি। আমি জানি আমার ঘুম আসবে না। নতুন কোথাও বেড়াতে গেলে আমার এমন হয়। কক্সবাজার যাওয়ার সময়ও সারা রাত ঘুমাই নি। এবারও তেমন হবে। তবু চেষ্টা করতে অসুবিধা কোথায় ! চোখ বন্ধ করি, আবার খোলে ফেলি। কিছুক্ষণ এমন করে দাঁড়িয়ে দেখি - আমার মত আরও অনেকে নির্ঘুম। কেউ কেউ ট্রেনের হকারদের কাছ থেকে এটা সেটা কিনে খাচ্ছে। কেউ শুধু শুধু বসে আছে। আমিও একজন হকার ডেকে কড়া ঝালের চানাচুর বানানো খাই । ঘুম যখন আসবে না, তখন এই উত্তম। মনে চাচ্ছিল একটু ধূমায়িত চা খেতে। একজন হকার নিয়েও এসেছিল। কিন্তু ঘুমের কথা চিন্তা করে বাদ দেই। শেষ রাতে যদি একটু ঘুম আসে ! হায়, কে জানতো এই ঘুম আজকের রাতে তো জুটবেই না, আগামীকাল সারাদিনেও সুযোগ পাবো না। হলোও তাই। অথচ দেখ, পাশে উমর ফারুক কেমন দিব্যি ঘুমাচ্ছে। বড্ড হিংসা হচ্ছে।
অবশেষে রাত ২ টা ৪০ মিনিটের সময় ট্রেন "শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে" এসে থামে। আর এখানের যাত্রীগণ হুড়মুড় করে ট্রেন ছেড়ে নেমে পড়ে। আমরাও মৌলভীবাজার জেলার 'শ্রীমঙ্গল' নামক থানার এই রেলস্টেশনে নেমে পড়ি। আমাদের এবারের আনন্দভ্রমণের প্রথম মঞ্জিল এটি।
স্টেশনের প্লাটফরমে নেমে ভাবনায় পড়ে যাই। এতো রাতে এখন কি করবো ?! ভেবেছিলাম ভোর ৪ টার সময় হয়তো শ্রীমঙ্গলে পৌঁছাবো। তখন রাত আর বেশি থাকবে না। আর এখন দেখি সবে মাত্র রাত ২ টা ৪৫ বাজে। নির্জন পাহাড়ি এই শহরে কি আর এখন গাড়ি পাবো?! পেলে হয়তো ডবল ভাড়া দিয়ে হলেও রাশেদের দাদার বাড়ি চলে যেতাম। পাই নি। তাই যাওয়াও হয় নি। অথচ প্ল্যান ছিল - শ্রীমঙ্গল এসে আগে রাশেদের দাদার বাড়ি যাবো। সেখানে বিশ্রাম নিয়ে তারপর ঘুরাফেরা করবো। যাত্রার শুরুতে ট্রেনের টিকেট কাটার সময় যেমন ট্যুরের দিনতারিখে গড়মিল হয়েছে ; শ্রীমঙ্গল এসেও বাকী পরিকল্পনায় রদবদল ঘটে। রাশেদের দাদার বাড়িকে কেন্দ্র করে শ্রীমঙ্গল এলেও সে বাড়িতে আর যাওয়ার সৌভাগ্য হয় নি।
শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে নেমে প্লাটফরমে কিছুক্ষণ পায়চারি করলাম। পাহাড়ি স্টেশন এটি। স্টেশনের আশপাশ-সহ প্রায় পুরো শ্রীমঙ্গল পাহাড়ে ঘেরা। এর প্রতিটি টিলা চা বাগান, রাবার বাগান, আনারস বাগান ও লেবু বাগানে ভরা। এসব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গলের পুরোটাই যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা একটি ভূস্বর্গ। এখানে প্রচুর বৃষ্টি হয়। কুয়াশাও পড়ে বেশ। পরিবেশও খুব চমৎকার। তাই এই শ্রীমঙ্গলেই গড়ে উঠে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বড় চা বাগান, রাবার বাগান, আনারস বাগান এবং লেবু বাগান।
শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে নামার পর থেকেই হিমেল পরিবেশের উপস্থিতি টের পাই। স্টেশনের বৈদ্যুতিক বাতির আলোতে হালকা কুয়াশার ছোঁয়া পাই। শরৎকালে কুয়াশা দেখে নিজের মধ্যে এক ধরণের রোমাঞ্চ অনুভব করি। মৃদু পায়ে হেঁটে হেঁটে কুয়াশার সাথে মিতালি গড়তে চেষ্টা করি। এই স্টেশনে আমার মত আরও কয়েকজন পর্যটক এভাবে আনমনা হাঁটছে। প্রকৃতির এই ভিন্ন স্বাদ খুব মনেপ্রাণে গ্রহণ করছে। আমি একই সাথে প্রকৃতি এবং তাদের দেখছি। আমার মনে হচ্ছে - ওরা হাঁটছে, আমি পায়চারি করছি । ওরা উপভোগ করছে, আমি অনুভবে জায়গা দিচ্ছি।
রাত এখনও অনেক বাকী। তাছাড়া এখন পর্যন্ত এক ফোঁটাও ঘুমাই নি। ঘুম আসবে না জানি। তবু চেষ্টা করতে হবে। না হয় দিনের বেলা ভ্রমণে কষ্ট হবে। ঘুমানোর জন্য স্টেশনের বিশ্রামাগারে আসলাম। রাশেদ এবং উমর ফারুক ইতোমধ্যে ঘুমের সাথে দোস্তাদুস্তি শুরু করে দিয়েছে ! আমিও তাদের মত বন্ধুত্ব করতে চাইলাম। হায়, তার জন্য যদি অবকাশ পেতাম ! ছেলেমেয়েদের বড় একটি পর্যটকদল এসে আমার ঘুম চেষ্টায় ব্যাঘাত ঘটায়। এই ছেলেমেয়ের দল আমাদের সাথে একই ট্রেনের একই বগিতে করে ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল এসেছে। এতোক্ষণ বাইরে হাঁটাচলা করে এখন বিশ্রামাগারে এসে চিৎকার চেচামেচি করে কথা বলতে শুরু করে। ফলে আমার থেকে তন্দ্রার শেষ চিহ্নটুকুও বিদায় নেয়।
আল্ট্রা মডার্ন এই ছেলেমেয়েদের সাথে প্লাটফরমের বিশ্রামাগারে সময় কাটতে থাকে। একটা সময় বিরক্ত লেগে উঠে। সময়টি সুন্দরভাবে কাটানোর জন্য আবারও স্টেশনের এদিক সেদিক হাঁটতে থাকি। পর্যটকদের আরও অনেকজনকে উসকো খুসকো ঘোরাফেরা করতে দেখি। হঠাৎ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে। চাইলে তো আমি এরচেয়ে ভালো সময় কাটাতে পারি। ব্যাগে প্যাডখাতা আছে। একটা কলম হলেই এখন চলবে। ভ্রমণবৃত্তান্ত লেখা শুরু করে দিতে পারবো। এতে রাত অনেক দ্রুত কেটে যাবে। যে ভাবনা সে কাজ।
কলম কিনতে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনের প্লাটফরমে থাকা দোকানগুলোতে ঘুরতে লাগলাম। কোনটিতে কলম পেলাম না। এতোগুলো দোকান, অথচ কোনটিতে কলম নেই ; মনে বড্ড চোট পেলাম। অথচ স্টেশনের এই দোকানগুলো চব্বিশঘণ্টা খোলা থাকে। অনেক লোকের আনাগোণা ঘটে। কারও কি কোন সময় কলমের প্রয়োজন পড়ে না?! পড়লে তো থাকতো। হায় আল্লাহ, ঢাকা থেকে এই শ্রীমঙ্গল আসা পর্যন্ত যতগুলো স্টেশন পড়েছে, সবগুলোতেই নিঝুম রাতে লোকে লোকারণ্য দেখেছি। এদের কেউ কি কলম কিনে না? যাহ। তা কিভাবে সম্ভব?! আর আমি তো শুধু শ্রীমঙ্গল স্টেশনই দেখেছি।
দোকানে কলম না পেয়ে রাশেদের কাছে সাহায্য চাইলাম। তার কাছেও নেই। উমর ফারুকের কাছে চেয়ে শেষ পর্যন্ত কলম পেলাম। এই কলম নিয়ে আবারও প্লাটফরমের বিশ্রামাগারে আসলাম। রুমটি এখন কোলাহলমুক্ত। দুইজন মেয়ে আর একজন ছেলে ছাড়া তাদের বাকী সঙ্গীরা এদিক সেদিক ঘুরছে। আমি এমন নিরব পরিবেশ পেয়ে দেরি না করে প্যাড বের করলাম। পৃষ্ঠা উল্টে কলম চালাতে লাগলাম। কয়েকপৃষ্ঠা লিখেও ফেললাম। যা এই সফরনামার শুরুতে শোভা পাচ্ছে। তাতে সময়টি ভালো কেটেছে। শেষ পর্যন্ত আর বেশি লিখতে পারি নি। ঘুমের প্রকটতায় মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। তাই কলমখাতা ব্যাগে রেখে চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমের ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকি।
পাঁচ/দশ মিনিট চেষ্টার পর সমাধান না পেয়ে বিশ্রামাগার ছেড়ে বাইরে চলে আসি। বাইরে আমাকে দেখে রাশেদ দৌঁড়ে এলো। আর বললো - ব্যবস্থা একটা করে ফেলেছি। শ্রীমঙ্গলের ট্যুর এবার জমবে। চান্দের গাড়ি দিয়ে আমরা শ্রীমঙ্গলের ৫/৬ টা স্পট ঘুরবো। আশ্চার্য হয়ে বললাম - এটা কিভাবে হলো? চান্দের গাড়ির ভাড়া তো অনেক। বললো - শেয়ারে নিয়েছি। আমাদের সাথে একই ট্রেনে ঢাকার ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির পাঁচজন ছেলে এসেছে। তাদের সাথে কথা বলে শেয়ারিং সিস্টেমে নিয়েছি। শোনে রাশেদের বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করলাম। সময়োপযোগী একটি সিদ্ধান্ত। ঠিক আছে ; আমরা তাহলে চান্দের গাড়ি দিয়ে শ্রীমঙ্গল পরিদর্শন করছি।
কিছুক্ষণ পূর্বে আমার লেখালেখির কারণে মনে হলো রাতের ঐ অংশটি তাড়াতাড়ি পার হয়ে গেছে। অবশেষে ভোরের সুসংবাদ নিয়ে চতুর্দিক থেকে ফজরের আযানের সুমধুর সুর ভেসে আসতে লাগলো। আযান শেষে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনের পাশে অবস্থিত মসজিদে সালাতুল ফজর আদায় করলাম। নামাযের পরই চান্দের গাড়িতে এসে আমরা আটজনে আরোহন করলাম। পাশে অপর আরেকটি চান্দের গাড়িতে ছেলেমেয়েদের ঐ বড় গ্রুপটি আরোহন করলো। দুইটি গাড়িই এক সাথে ছেড়ে দিলো। কিছুটা দূর এগিয়ে ভানুগাছ সড়কে অবস্থিত "পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্ট" নামক একটি রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামলো। আমাদের আজকের চান্দের গাড়ি সফরের শেয়ারিং পার্টনার ভার্সিটির পাঁচ ছেলে "পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্ট" বাদ দিয়ে "পানসি হোটেলে" খেতে চাইলো। সেটা বন্ধ থাকায় পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্টেই খেতে হলো।
পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে দেখি এখনও রেস্টুরেন্ট গোছগাছ করা হয় নি। চেয়ার টেবিল সব ঠিকঠাক করা হচ্ছে। আমাদের শ্রীমঙ্গল ট্যুরের গাইডম্যান বললো - কারও মোবাইলে চার্জ দেয়া লাগলে রেস্টুরেন্টে সে ব্যবস্থা আছে। যার যার লাগে দিয়ে নাও। সবাই সে সুযোগটি লুফে নিলো।
♥ [ বাকী অংশ পরবর্তী পর্বে দেখুন ] ♥



No comments:
Post a Comment
Note: Only a member of this blog may post a comment.