Breaking

Wednesday, December 5, 2018

সাত রঙের চা খেতে [ ৭ম পর্ব ]


সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশের রাস্তা দিয়ে বিছানাকান্দি অভিমুখে চলতে লাগলো। পাঁচ/সাত কিলোমিটার যাবার পর সিএনজি একটি বাড়ির সামনে এসে থামলো। ড্রাইভার বললো বাড়িটি ঘুরে আসেন। এক লন্ডন প্রবাসীর বাড়ি এটি। বছরে এক/দুই বার আসেন তিনি। বাড়ির আঙিনায় হরিণ, খরগোশ, বানর, দেশি বিদেশি হাঁস মুরগি এবং গাছ ভর্তি নানান প্রজাতির পাখি দেখবেন।

আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। হ্যাঁ সত্যিই তো। অনেকগুলো হরিণ , কয়েকটি খরগোশ, দুইটি বানর, অনেকগুলো টার্কি মুরগি - প্রত্যেক জাত ভিন্ন ভিন্ন খাঁচায় ; এবং গাছে গাছে পাখি আর পাখি। মজার ব্যাপার হলো - এই পাখিগুলোর বিষ্টায় গাছের পাতা এবং বাড়ির সীমানা দেয়াল পর্যন্ত সাদার রং ধারণ করে ফেলেছে। আমরা এমন প্রাচুর্যে ভরা বাড়িটি ঘুরে দেখে সত্যি বিস্মিত হলাম। তার রুচির প্রশংসা না করে পারলাম না। অনেক ধনবান ব্যক্তি আছে ; কিন্তু এমন রুচি ক'জনের আছে?

সিএনজি ছেড়ে দিলো। আবারও বৃষ্টির দেখা । আধা ঘণ্টার মত বৃষ্টির মাঝে সিএনজি চললো। তারপর বৃষ্টি পড়া বন্ধ হলো । তারপর বিছানাকান্দিসহ পুরো পথে বৃষ্টি আর কোন সমস্যার সৃষ্টি করে নি। বিছানাকান্দিগামী এই পথটি দিয়ে চলার সময় যে দৃশ্যটি বারেবারে নজরে পড়েছে ; তা হলো - "গরুর পাল মাঠে চষে বেড়ানো। পাশে মালিক বা রাখাল ছাতা নিয়ে বসে থাকা"। পুরো পথটায় এমন দৃশ্য দেখতে বেশ ভালোই লেগেছিল।
ড্রাইভার এক জায়গায় এসে ডেকে উঠলো। বললো - ঐ যে দূরে কুয়াশা ঘেরা সবুজ পাহাড়ের মত দেখা যাচ্ছে না ; ঐটা ভারত। আপনারা একটু লক্ষ করুন। দেখুন তো - পাহাড়ের এ সারিগুলোর এক জায়গায় দুই পাহাড়ের মাঝে একটু ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছে। দেখছেন আপনারা? হুম দেখেছি। ঐটাই বিছানাকান্দি। ওখানে আপনারা যাবেন। একেবারে বাংলাদেশ সীমান্তে। তাই নাকি? তা ঐ পাহাড় এখান থেকে কতটা দূর? প্রায় ১২/১৫ কিলোমিটার। আর হ্যাঁ, আপনাদেরকে সামনের বাজারে নামিয়ে দেবো। তারপর ট্রলার ভাড়া করে আপনারা নদীপথে বিছানাকান্দি যাবেন।

পীরের বাজার নামক একটি বাজার, যা সিলেটের গোয়াইনঘাট থানার অন্তর্ভুক্ত - এখানে সিএনজি আমাদেরকে নামিয়ে দেয়। আমরা নেমে দুই গ্রুপ মিলে ট্রলার ভাড়া করি। তারপর তাতে আরোহন করে দুপুর ১২ টা ৪০ মিনিটে বিছানাকান্দি অভিমুখে চলা শুরু করি।

বিছানাকান্দির জলপথে ট্রলার চলছে। আমরা নদীর উভয় তীরের প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে থাকি। পীরের বাজার থেকে বিছানাকান্দি যাবার সময় পুরো পথে কয়েকটা দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বারেবারে। তা হলো - পাথর স্তুপ, পাথর উত্তোলন, নৌকা দিয়ে পাথর বহন, পাথর ভাঙ্গন ইত্যাদি ইত্যাদি। বাংলাদেশ সীমান্তের এই অঞ্চলটি পাথর উত্তোলনে অন্যতম। এখানের পাথর পুরো দেশে সাপ্লাই করা হয়। সেগুলো বড় বড় স্থাপত্যশিল্পে কাজে লাগানো হয়। এই অঞ্চলের মানুষদের অন্যতম পেশা এই পাথর উত্তোলন, পাথর বিক্রি করণ। ছোট বড় প্রায় সবাইকে এই কাজ করতে দেখা যায়।
আমরা ট্রলারে বসে বিছানাকান্দি পৌঁছার অপেক্ষা করছি। এমন সময় হঠাৎ চমক। আরে, নদীর মাঝে বিমান এলো কোত্থেকে? বিমানের পিছনের অংশ যে নদীর তীরে পড়ে আছে। কোনো দূর্ঘটনার কবলে পড়ে বিমান এখানে ছিটকে পড়েছে নাকি? নাহ, আশেপাশের অবস্থা দেখে তো তেমন মনে হচ্ছে না। তাহলে? বিস্মিত না হয়ে কি পারা যায়? এযে নতুন চমক। হঠাৎ মরিচিকা দেখার মত চমক। এটি যে নদীপথের বিমান ! এই বিমানটি জলপথে চলে। মানুষদের চমকানোর জন্য সম্পূর্ণ বিমান আদলে এটি তৈরি করা হয়েছে। বুঝতে পেরে নিজের অজান্তে আনন্দিত হয়ে পড়ি।

বিছানাকান্দি প্রায় নিকটবর্তী। দূরের পাহাড়গুলোও যত এগুচ্ছি, ততো স্পষ্ট হচ্ছে। পাহাড়ের একটা গুণ আছে। দূর থেকে দেখতে মনে হয় খুব কাছে। কিন্তু কাছে যেতে গেলে বুঝা যায় কত দূর। হ্যাঁ, কাছে মনে করে আমরা বারেবারে শুধু ধোঁকা খাচ্ছি। কত সুন্দর পাহাড় ! কত বিশাল ! যেন আকাশ ছুঁয়ে আছে। দূর থেকে প্রতিটি পাহাড়ে ঝর্ণাধারা বহমান হতে দেখা যাচ্ছে। এতো মনোমুগ্ধকর ঝর্ণা ! চোখ ফেললে ফেরানো যায় না। কাছে যেতে ইচ্ছা করে। হাত দিয়ে স্পর্শ করে ঝর্ণার পানি ছিটাতে মন চায়। হে পাহাড়, ইনশাআল্লাহ অচিরেই আসছি তোমার পাদদেশে। মনে মনে খুব আফসোস হলো। ইশ, এই পাহাড়গুলো যদি বাংলাদেশের হতো !!

দুপুর ১ টা ২০ মিনিটে ট্রলার আমাদেরকে বিছানাকান্দি ঘাটে নামিয়ে দেয়। আমরা ট্রলারে বসে ড্রেস চেঞ্জ করে নেই। একটু পরেই ঝর্ণার প্রবাহিত পানিতে গোসল করবো। পাথুরে ভূখণ্ডে ঝর্ণার স্বচ্ছ হিমেল পানিতে যে গোসল করে নি, তাকে এর মজা বুঝানো অসম্ভব। বুঝতে হলে ঝর্ণার কাছে আসতে হবে। পাথুরে ভূখণ্ডের প্রবাহমান স্রোতে নামতে হবে। আস্তে করে নিজেকে তার নিচে ডুবিয়ে দিতে হবে। বাকীটা নিজেই অনুভব করতে পারবে। তবে হ্যাঁ, এসব জায়গায় সতর্ক থাকতে হয়। একটুর বেখেয়ালে মাথা ফেটে যাওয়া ; হাত, পা ভেঙ্গে যাওয়ার মত দূর্ঘটনা ঘটা খুব স্বাভাবিক। পাহাড়ের উপর থেকে ঝর্ণা বয়। পাদদেশে পাথুরে ভূমির উপর থেকে নিচের দিকে প্রচুর স্রোতের সৃষ্টি হয়। ফলে সামান্য অসতর্কতায় পা ফসকে দূর্ঘটনা ঘটে যায়। আমি সতর্ক থাকা সত্ত্বেও দুইবার পা ফসকে পড়ে যাই। তাতে ডান হাতের বৃদ্ধ আঙুলে বড় চোট পাই। চামড়া ফেটে রক্ত বের হয়। বাম হাতের কনুইয়েও আঘাত পাই।

যাইহোক, ট্রলার থেকে নেমে বিছানাকান্দি পর্যটনকেন্দ্রের অস্থায়ী এক রেস্টুরেন্টে মধ্যাহ্নভোজন সম্পন্ন করি। তারপর ব্যাগপত্রগুলো বড় একটি পাথরের উপর রেখে স্রোতের মাঝে নামি। ঠাণ্ডা হিম পানি। অল্পতেই শীতল প্রলেপ পুরো শরীরে এঁকে যায়। যেখানে গোসল করছি তার থেকে একটু দূরে ভারত সীমান্তে দু'টি পাহাড়ের মাঝে একটি ব্রিজ দেখা যাচ্ছে। ব্রিজটি যেন সৌন্দর্যের আরেকটি ধারা সৃষ্টি করে রেখেছে। ঐ ব্রিজটির অপর পাশে কয়েকটির ঝর্ণা। বিছানাকান্দির পাথুরে এই ভূখণ্ডটি মূলত ঐসব ধর্ণার পানি দিয়ে সিক্ত হয়। আপেক্ষ থেকে গেলো। যদি মূল ঝর্ণার নিচে গিয়ে দাঁড়াতে পারতাম ! আর এই পাহাড়গুলো বাংলাদেশের অংশে পড়লেই বা কি ক্ষতি হতো?!

যাক, ''দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানো" প্রবাদের মত বিছানাকান্দির ঝর্ণায় সৃষ্ট উপর থেকে নিচে প্রবাহমান স্রোতে গোসল করতে থাকি। অনেক পর্যটক এখানে । সবাই হইহোল্লড় করে গোসল করছে। আমরাও দুই দলের আট মিলে  বেশ মজা করে গোসল করতে থাকি। কয়েকবার স্রোতের মাঝে নিজেকে হালকা করে ছেড়ে দিয়ে আনন্দ পেতে চেষ্টা করি। প্রত্যেকবারই পাথরের আঘাতে কুকিয়ে উঠি। একবার তো পাথর ঝাপটে ধরেও রক্ষা পাই নি। স্রোত টেনে নিচের দিকে নিয়ে আরেক পাথরের সাথে ধাক্কা খাওয়ায়। ঐটাকে ধরতে গিয়েও হাত পিছলে যায়। আবারও আঘাত। নাহ, কত আর সহ্য করা যায় ! বহু কষ্টে পাথর ঝাপটে ধরে দাঁড়িয়ে নিজেকে রক্ষা করি।

একজন ফটোগ্রাফারের মাধ্যমে এখানে কিছু ছবি তুলি। পুরো সিলেট সফরে এই প্রথম আগ্রহভরে ছবি তুললাম। এখানে অবস্থানের প্রতিটি মুহূর্তে যেন আনন্দ অনুভব করেছি। পর্যটকে ভরপুর এই বিছানাকান্দি সত্যিই অনেক সুন্দর। এখানে অনেকদিন অবস্থান করলেও আশা করি বিস্বাদ অনুভব হবে না। ঝাঁপাঝাপি, পানি ছিটাছিটি, স্রোতের মাঝে ডুবাডুবি - এগুলো তুলনা শুধু এগুলোই।

দেড় ঘণ্টার মত বিছানাকান্দির জলস্রোতে গোসল করলাম। তারপর শুকনো পাথুরে অঞ্চলে এসে পোশাক পাল্টে ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিলাম। ফেরত আসার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বিছানাকান্দির অস্থায়ী বাজারে গেলাম। আমাদের শেয়ারিং পার্টনার ভৈরবের ঐদলটি এই বাজার থেকে ইন্ডিয়ান জিনিসপত্র কেনাকাটা করলো। আমিও একটি সুগন্ধি সাবান এবং কিছু চকলেট কিনলাম। বাকী কেনাকাটা জাফলং গিয়ে করবো বলে ভেবে রেখেছিলাম। কে জানতো, সে সৌভাগ্য আর আমার হবে না ! জানলে হয়তো এখান থেকে প্রয়োজনমত কিছু জিনিসপাতি ক্রয় করতাম। কিন্তু হায়, কেনাকাটা বলতে কিছুই হয় নি । ইতোপূর্বে কক্সবাজার সফরে টাকা হারিয়ে হয় নি। এবার ভাগ্যের দোষে সম্ভব হলো না। আখলাককে বছরখানেক পূর্বে যে টাকা ধার দিয়েছিলাম, সে টাকার প্রায় পুরোটাই রয়ে গেছে। কেনাকাটা করার সুযোগ হয়নি। জাফলং যাবো বলে ভেবে রেখে সে সুযোগ হাতছাড়া করি। জাফলং না যাওয়ার কারণ সন্ধার পর বলবো।

কেনাকাটা শেষে ট্রলারে ফেরত আসলাম। বিছানাকান্দির সৌন্দর্যকে শেষ বারের মত দেখলাম। ট্রলার ছেড়ে দিলো। বিছানাকান্দির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য এক সময় আমাদের থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো। বিকাল সাড়ে ৩ টার সময় ট্রলার বিছানাকান্দির ঘাট থেকে ছেড়েছিল। ৪ টার সময় পীরের বাজার ব্রিজের তল দিয়ে এসে এখানের ঘাটে নামিয়ে এলো। আমরা ভাড়া পরিশোধ করে যার যার সিএনজিতে এসে বসি। আমাদের এতক্ষণের ট্যুর শেয়ারিং পার্টনার - ভৈরবের ঐ পর্যটকদল থেকে বিদায় নিয়ে সিলেট শহর অভিমুখে চলতে থাকি। বিদায় হে ভৈরবি বন্ধুরা। তোমাদের সাথে এই প্রথম দেখা ; হয়তো এটিই শেষ। চলার পথে এরকম ঘটনা অনেক ঘটে। তবে তাদের মনে থাকে না। তোমাদের মনে থাকবে। আমার পুরনো অভ্যাসানুযায়ী নামগুলো হয়তো স্মরণে থাকবে না। কিন্তু চেহারাগুলো চোখের তারায় ভাসমান থাকবে। ঘটনাচক্রে ভবিষ্যতে কখনও সামনে পড়লে আশা করি চিনে ফেলবো।

বিছানাকান্দি থেকে রওয়ানা দিয়ে সন্ধার পূর্ব মুহূর্তে সিলেট শহরে এসে পৌঁছলাম। সিএনজির ড্রাইভার থেকে বিদায় নিয়ে আবারও শাহজালাল রহ. এর দরগাহে আসলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম - রাতের ভিতর "রাজা গৌড় গোবিন্দের সেই রাজপ্রাসাদের স্থান এবং সিলেটের বিখ্যাত হযরত শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়" ঘুরে আসবো। প্রথমে শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবো। কিন্তু অবস্থার প্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া হলো না। গেলাম 'রাজা গৌড় গোবিন্দ হিলে'।  অবশ্য রাজার এই হিলটিও ভালোভাবে পরিদর্শন করতে পারি নি। সিলেট জেলা প্রশাসকের বাসভবন পাশে হওয়ায় এবং সন্ধার পর সময় গড়ানোর কারণে সিকিউরিটি গার্ড আমাদেরকে রাজা গৌড় গোবিন্দ হিল ভালোভাবে দেখতে দেয় নি। রাজা গৌড় গোবিন্দ কে?  তার ইতিহাস কি - এর বিবরণ আমি দুই ঘণ্টা পর সুরমা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে দেবো। পূর্বে বলেছিলাম - শাহজালাল রহ. ও তার আগমন ইতিহাস এবং সুরমা নদী প্রসঙ্গে কিছু কথা ফেরত পথে সুরমা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বলবো। হ্যাঁ, প্রসঙ্গক্রমে সবার আলোচনা আসবে। উমর ফারুক শ্রোতা হিসাবে পাশে থাকবে। রাশেদ পুনরায় শ্রীমঙ্গল চলে যাবে।

♥ [ বাকী অংশ পরবর্তী পর্বে দেখুন ] ♥

No comments:

Post a Comment

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Adbox