Breaking

Wednesday, December 5, 2018

সাত রঙের চা খেতে [ ৬ষ্ঠ পর্ব ]

সকাল ৬ টার সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। ফলে পাখা ঘুরা বন্ধ হয়ে যায়। আর এর উসিলায় আমাদের ঘুম ভাঙ্গে। বিদ্যুতের এই সমস্যা না হলে হয়তো দুপুর করে ঘুম থেকে উঠতাম। দুই দিনের ঘুম এক সাথে বলে কথা। যাক, আমাদের জন্য রহমত হয়ে বিদ্যুৎ চলে গেলো। যার কারণে গরমে থাকতে না পেরে বিছানা ছেড়ে দ্রুত উঠে গেলাম। আর ০৯/০৯/২০১৮ ইং রবিবারের প্রভাতকে বারান্দায় এসে স্বাগত জানালাম।

ইতোমধ্যে সূর্য উঠে গেছে। তাই দ্রুত প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সেরে হোটেল ত্যাগ করলাম। একটি সিএনজি নিয়ে 'আম্বরখানা' নামক সিলেটের ব্যস্তবহুল এলাকায় আসলাম। এখানে সকালের নাশতা করে নিলাম। হোটেলে বসে নাশতা করার সময় একজন হোটেলবয় আমাদের কথাবার্তা শোনে বুঝে নেয় আমরা এখানের পর্যটক। তাই আমরা এখন কোথায় যাবো - এসম্পর্কে জিজ্ঞাস করে। রাতারগুল এবং বিছানাকান্দি যাবার কথা বললাম। হোটেলবয় তা শোনে একে মোক্ষম সুযোগ মনে করলো। প্রস্তাব রাখলো - আমার একটা গাড়ি আছে। অল্প খরচে আপনাদের রাতারগুল, বিছানাকান্দি ঘুরিয়ে আনবে। ড্রাইভারকে ডাকবো? বললাম - ডাকো। সিএনজির ড্রাইভার এলো। হোটেলবয় আমাদেরকে তার পরিচিতজন বলে পরিচয় করিয়ে দিলো। আমরা যে রাতারগুল এবং বিছনাকান্দি যাবো - এটাও ড্রাইভারকে জানালো। আমাদের থেকে যাতে কম ভাড়া নেয়, তার জন্য অনুরোধ করলো।

ড্রাইভারকে কাছে ডাকলাম। ভাড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাস করলাম। সে ২২০০ টাকা দাবি করলো। এটা নাকি সর্বনিম্ন রিজার্ভ ভাড়া। দাম শোনে হেসে দিলাম। বললাম - আচ্ছা, বিছানাকান্দি যদি আমরা না যাই, শুধু রাতারগুল যাই ; তাহলে কত লাগবে? ১২০০ টাকা। আবারও হেসে দিলাম। জিজ্ঞাস করলাম - কমে কত পারবে? বললো - এটাই কম ভাড়া। আপনারা হোটেলবয়ের পরিচিত মানুষ বলে কমিয়ে বলেছি। এর থেকে কমে যাওয়া সম্ভব না। মনে মনে ভাবলাম - বাটপারি করবি ভালো কথা।  গ্রাহক কেন বুঝবে যে, তুই অভিনয় করছিস ! আমি তো জানি তোরা দু'জন গোপনে চুক্তিবদ্ধ। আরে বাবা, আমরা দেশের রাজধানীতে থেকে অভ্যস্ত। গাঁও গেরাম থেকে বেড়াতে আসি নি। ওখানের বাটপারদের অভিনয়শিল্প ও দক্ষতা তোমাদের চেয়ে শতগুণ বেশি। আমরা ঐগুলোর দেখা পাই প্রতিনিয়ত। আর তোমরা তো হলে বিভাগীয় শহরের বাটপার। কাঁচা অভিনয়ে কি পটানো সম্ভব? মনে মনে এসব ভেবে হাসলাম। বললাম - আচ্ছা ঠিক আছে, শেষবারের মত বলে দাও কত রাখতে পারবে। বেটা কমিয়ে দাবি করলো - রাতারগুল, বিছানাকান্দি গেলে ২০০০ টাকা। শুধু রাতারগুল গেলে ১০০০ টাকা। শোনে আবারও হাসি দিলাম। তোমার মোবাইল নাম্বার দাও। এর চেয়ে কম দামে অন্য বোন সিএনজি না পেলে তোমাকে কল দেবো। ড্রাইভার নাম্বার দিতে উসখুস করছে। আমরা এরচেয়ে কমে সিএনজি পাবো না বলে নানানভাবে বুঝানোর চেষ্টা করছে। হোটেলবয়ও তার সাথে সুর মিলাচ্ছে। আমি তাদের কোন কথা না বলে উঠে চলে আসি।

হোটেল থেকে বেরিয়ে মনে হলো - আরে, আমি তো হোটেল বিল পরিশোধ করি নি। অথচ আমি হলাম এই সিলেট সফরে তিনজনের ব্যাংক এবং অঘোষিত সফর পরিচালক। সমস্ত খরচের হিসাব নিকাশ এবং সবার টাকা পয়সা আমার কাছে। আমি এক হাতে সব খাতে ব্যয় করি। তো মনে হতেই হোটেলে ফিরে আসি। বিল পরিশোধ করি। একি ! রাশেদ এখনও হোটেলে বসে আছে যে ! ঐ ড্রাইভার তাকে কি সব যেন বুঝাচ্ছে। অবাক হলাম। বেটা আমাদের ধোঁকা দিয়ে টাকা হাতাতে চাচ্ছে - রাশেদ এটা বুঝতে চাচ্ছে না কেন?! তাকে ডেকে নিয়ে এলাম। বেচারা হোটেলবয় এবং তার ড্রাইভার অপরিচিত পর্যটকদের থেকে অজ্ঞতার সুফল ভোগ করতে পারলো না। তাদের জন্য সমবেদনা রইলো।

আমরা হেঁটে হেঁটে রাতারগুল, বিছানাকান্দিগামী সিএনজি স্টেশনে আসলাম। সিএনজির লোকাল ভাড়া এবং রিজার্ভ ভাড়া জিজ্ঞাস করলাম। দুই মিনিট হাঁটার বদৌলতে ভাড়া ৭০০/৮০০ টাকার মত কমে গেলো। হায়রে মানুষ !
স্টেশন থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে রাতারগুল অভিমুখে ছুটলাম। সিএনজি শহরের ব্যস্ত সড়ক দিয়ে এগুতে লাগলো। সিলেট ক্যাডেট কলেজের পাশ দিয়ে অগ্রসর হয়ে শহর ছেড়ে চলে এলো। সামনে সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। "ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর"। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক তিনটি বিমানবন্দরের মধ্যে এটি অন্যতম। এখানের এই বিমানবন্দরের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো - সরাসরি লন্ডনের বিমান পাওয়া যাওয়া । ঢাকা বা চট্টগ্রামে যা পাওয়া যায় না। আমরা এমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশ দিয়ে চলতে থাকি। বিমানবন্দরটির দেয়াল একটু নিচা। ফলে রাস্তা থেকে ভিতরটা পুরো স্পষ্ট দেখা যায়। ঐ যে দূরে একটি বিমান দেখা যাচ্ছে। অবয়বে মনে হচ্ছে এটি 'বাংলাদেশ বিমান'। সম্ভবত অভ্যন্তরীণ বিমান। আন্তর্জাতিকও হতে পারে। জানি না। ধারণা করলাম।

বিমানবন্দর ঘেঁষা সড়কপথ দিয়ে এগুতে থাকলাম। যে সড়কের অপর পাশে ছোট ছোট টিলা। কয়েকটি টিলায় চা বাগান দেখা যাচ্ছে। তবে সেগুলো শ্রীমঙ্গলের মত এতো বিশাল না।

বিমানবন্দরের পাশ দিয়ে কয়েকমিনিট চলার পর সিএনজি ডান দিকে মোড় নেয়। এই পথটি দিয়ে রাতারগুল যাবো। আবার বিমানবন্দরের দেয়াল ঘেঁষে যে পথটি সোজা চলে গেছে, ঐটা দিয়ে বিছানাকান্দি যায়। আমরা আগে রাতারগুল যাবো। সিএনজি রাতারগুলগামী পথে ঢুকে। এখানে পাথর ভাঙার অনেকগুলো কারখানা দেখি। সবগুলোতে বড় বড় পাথর এনে ছোট ছোট করে ভাঙা হয়। এই কারখানাগুলো পেরিয়ে আধা ঘণ্টার মত পথ চললো। তারপর আমাদেরকে নামিয়ে দিলো। যেখানে নামিয়ে দিলো - তার অদূরেই রাতারগুল জলাবন।নৌকা ভাড়া করে এই বন ভ্রমণ করতে হয়।

এই বনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো - এই বনের গাছগুলো বর্ষাকালে ২০–৩০ ফুট পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে। বাকি সারা বছর, পানির উচ্চতা ১০ ফুটের মতো থাকে। বর্ষাকালে এই বনে অথৈ জল থাকে চার মাস। এর পর বিভিন্ন খালের মাধ্যমে পাশের হাওড়ে চলে যায়। বন্য জলজ প্রাণীগুলোর অনেক তখন সে হাওড়ে স্থানান্তর হয়। পৃথিবীতে এরকম বন নাকি ২৬ টার মত আছে। তারমধ্যে বাংলাদেশে একটি। বাংলাদেশের ঐ একটিই হলো - "রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট বা রাতারগুল জলাবন"। চিরসবুজ এই বন গুয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত এবং চেঙ্গির খালের সাথে একে সংযুক্ত করেছে। এখানে সবচেয়ে বেশি জন্মায় "করচ গাছ"। যেগুলো পানির নিচে ডুবে থাকা সত্ত্বেও মরে না। অথচ অন্যান্য গাছ মরে যায়।

সিএনজি যেখানে আমাদেরকে নামিয়ে দিয়েছে, সেখান থেকে জলাবনের নৌ'ঘাট ২০০/৩০০ গজ দূরে। এই পথটা হেঁটে সামনে গেলে রাস্তার উভয় পাশে দুইটি ছাউনি ঘর পড়ে। রাতারগুল ভ্রমণকারীদের বিশ্রামের জন্য এগুলো বানানো হয়েছে। আর ছাউনি ঘর দু'টির পরই রাস্তা শেষ। এখানেই নৌ'ঘাট। অনেক নৌকা রয়েছে এই ঘাটে। এটি ছাড়া রাতারগুলে আরও কয়েকটি ঘাট রয়েছে। সবগুলোতেই প্রচুর পরিমাণে নৌকা থাকে।

আমরা ঘাটে এসে মাঝিদের সাথে কথা বলা শুরু করি। আমাদের আগে ভৈরব থেকে আসা পাঁচজনের আরেকটি গ্রুপ ইতোমধ্যে মাঝিদের একজনের সাথে তাদের চুক্তি ফাইনাল করে ফেলে। এখানে নাকি ৭৫০ টাকা নৌকা ভাড়া। এটি সরকারীভাবে পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত মূল্য। বড় একটি সাইনবোর্ডে তাই লেখা। তারপরও আমাদের মাঝি বেশি ভাড়া দাবি করে। আমরা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে এক পয়সাও বেশি দিতে পারবো না বলে জানিয়ে দিলাম। অগত্য তারা পাঁচজন একটি নৌকা এবং আমরা তিনজন আরেকটি নৌকা নিয়ে জলাবনের উদ্দেশ্যে চলতে লাগলাম।

পথিমধ্যে তাদের সাথে পরিচয়পর্ব হয়। আজকেই তারা ভৈরব থেকে এসেছে। আবার আজকেই ফেরত চলে যাবে। মাঝে দিনটা রাতারগুল এবং বিছানাকান্দি ঘুরবে। বিছানাকান্দি ঘুরার কথা শোনে শেয়ারিং এর প্রস্তাব রাখলাম। তারা তা লুফে নিলো। এতে উভয় গ্রুপেরই লাভ। বিছানাকান্দির ট্রলার ভাড়ায় মাথাপিছু খরচ কমে যাবে। চুক্তি ফাইনাল করে নিলাম - রাতারগুল ভ্রমণ শেষে উভয় গ্রুপের সিএনজি একসাথে যাবে। বিছানাকান্দিগামী ঘাটে আমরা এক গ্রুপ সেজে ট্রলার ভাড়া করবো। নয়তো আবার ওদের দাম বেড়ে যাবে। ওরা ডবল ভাড়া চেয়ে বসতে পারে।

রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট বা রাতারগুল জলাবনের দিকে নৌকা নিয়ে এগুতে থাকলাম। বনের ভিতর আস্তে করে ঢুকে পড়লাম। হ্যাঁ, এখন আমরা রাতারগুল জলাবনে ভ্রমণ করছি। দূরে বনের লাইট টাওয়ার বা বাতিঘর দেখা যাচ্ছে। ওদিক থেকে আরেকটি নৌকা ঘুরা শেষ করে ফেরত আসছে। আমরা তাদের পাশ কেটে জলাবনের অভ্যন্তরে এগিয়ে চলছি। ভৈরব থেকে আগত পর্যটকদল এবং আমরা তিনজন এক সাথে আনন্দভ্রমণ করতে থাকি। এটি ব্যতিক্রমধারার একটি বন। না দেখলে আফসোস থেকে যেত। আবার ইন্টারনেটে রাতারগুল জলাবনের ভিডিওগুলোতে যতটা সুন্দর দেখেছিলাম, ততোটা ভালোও লাগছে না। মাঝি বললো - ঐসব ভিডিও নাকি বর্ষাকালের। তখন নাকি রাতারগুল ভরা যৌবনে থাকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তখন এখনের চেয়ে বেড়ে যায়। হয়তো তাই। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও তেমন লেখা। একটু আগে এর কারণও আমি বলেছি। কিন্তু আমরা তো তা দেখতে পেলাম না। বর্ষার পর পর এখান থেকে পানি সরে গেছে। তবে শুকিয়ে যায় নি। এখনও জলাবনে পানির গভীরতা ১০ ফুটের মত।

নৌকা লাইট টওয়ারের কাছে এলো। আমাদের সাথে ঘাট থেকে একজন বৃদ্ধ নৌকায় উঠেছিল, তাঁকে নামিয়ে দিলো। তারপর আবারও ছেড়ে দিলো। বনের গভীরতম অংশের দিকে আমরা এগুতে থাকলাম। ভৈরবের ঐ দলটি তাদের নৌকা নিয়ে ইতোমধ্যে কিছুদূর এগিয়ে গেছে। আমরা আমাদের মাঝিকে জোরে চালিয়ে তাদের কাছাকাছি  পৌঁছাতে বললাম। সে আমাদের নিয়ে পৌঁছে গেলো। একসাথে উভয় নৌকা রাতারগুল জলাবনের নৌপথ দিয়ে চলতে লাগলো।

এই বনে অদ্ভুত সব গাছ রয়েছে। তবে হ্যাঁ, এগুলো বনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। এর মধ্যে একটি গাছের নাম 'করচ'। যার কথা একটু আগেও বলেছি। আমরা এই অদ্ভুত গাছের বনটি দেখতে দেখতে এক প্রান্তে গিয়ে ফেরত আসার জন্য ঘুরে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ এক জায়গায় নৌকা থামিয়ে গল্প করলাম। তারপর আরেকপথে নৌকা নিয়ে এগুতে শুরু করলাম। পথেই বানরের দেখা। রাতারগুল জলাবনে বসবাসকারী 'বানর'। এতক্ষণ যাবৎ এই প্রাণীগুলোকে চিৎকার চেচামেচি করে বন মাতিয়ে রাখতে এবং এক গাছ থেকে আরেক গাছে ছুটতে দেখলাম। অথচ আমাদের দেখে এগুলো পালাতে শুরু করে। ভেবেছিলাম - গাছের ডাল ভেঙে আমাদের দিকে ছুঁড়ে আমাদেরকে ভয় দেখাবে ; উল্টো এগুলোই ভয়ে পালিয়ে গেলো।

আমরা আরও কিছুটা পথ এগিয়ে একটা গাছের কাছে থামলাম। গাছটির ডালা সিঁড়ি সিস্টেমে পেঁচানো। দেখতেও বেশ। ছোট্ট মাঝি আমাদেরকে গাছটিকে উঠতে বললো। আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠার মত তরতর করে গাছটিতে উঠলাম। পা দুলিয়ে জলাবনে গাছে বসার স্বাদ নিলাম। আমাদের দেখাদেখি ভৈরবের ওরাও উঠলো।  সবাই মিলে কতক্ষণ আনন্দকোলাহল করলাম।

আবারও নৌকায় এসে বসলাম। ছোট্ট মাঝির খোঁজখবর নিলাম। ও নাকি এবছর পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। আজকে পূজার ছুটি বলে নৌকা চালাতে আসে। এই মুহূর্তে কেন জানি তার নামটি স্মরণে আসছে না। হয়তো গুরুত্ব দেই নি বলে। অথবা আমার নাম ভোলার অভ্যাসটি এখনও রয়ে গেছে - এর প্রমাণ পেশ করতে।

জলাবন ঘুরা শেষে লাইট টওয়ার বা বাতিঘরের কাছে আসলাম। দৌঁড়ে সিঁড়ি বেয়ে টাওয়ারে উঠা শুরু করলাম। তা দেখে নিচ থেকে ভৈরবের ঐ গ্রুপটির একজন চিৎকার করে বলতে লাগলো - "খবরদার লাফ দেবেন না। পৃথিবীতে প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার ইতিহাস নতুন না। লাইলি-মজনু, শিরিন-ফরহাদ, রোমিও-জুলিয়েট : তারাও প্রেমে ব্যর্থ হয়েছে। প্রিয়জনের সঙ্গ তাদেরও ভাগ্যে জুটে নি। তাই বলে তারা এভাবে লাফ দিয়ে জীবন বিলায় নি। প্রিয়তমার জন্য আজীবন অপেক্ষা করেছে। তাই হে বন্ধু, আবারও বলছি - শুধু শুধু লাফ দিয়ে নিজের জীবন শেষ করবেন না। সবুর করুন"।

তার এই বিনোদনধর্মী কথা শোনে আমার হাসি পেয়ে যায় । টাওয়ারে উঠার গতি আরও বাড়িয়ে দেই। সেই সাথে আমিও সুর মিলাই - "না না। আমাকে বাঁধা দেবেন না। আমি লাফ দেবোই। আমার প্রেমের ইতিহাস নতুন করে তৈরি করবো। আমি লাইলি মজনুর চেয়ে ভিন্ন। আমি আমার প্রেমিকা ছাড়া শূণ্য। তাকে ছাড়া এই জীবন রেখেও না রাখার মত। সুতরাং আমি লাফ দেবো। পৃথিবীকে আমার প্রেমের নতুন গল্প উপহার দিবো"।  আমার কথা শেষ হতেই উভয় গ্রুপের মাঝে অট্টহাসির রোল পড়ে। প্রাণখুলে সবাই কয়েকমিনিট হাসে। আমিও হাসি।

টাওয়ারের উপর সবাই মিলে কিছুটা সময় কাটালাম। পাঁচতলা উপর থেকে রাতারগুলের নতুন আরেকটি রূপ দেখলাম। পুরো বন এখান থেকে কয়েক সেকেন্ডে দেখে শেষ করা যায়। যদিও নৌকা দিয়ে ঘুরতে হলে কয়েক ঘণ্টা দরকার। টাওয়ারের উপর থেকে রাতারগুল জলাবনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া 'গুয়াইন নদী'টিও ঝাপসা চোখে দেখলাম । একটা বালু/পাথরবহনকারী ট্রলার তার মধ্য দিয়ে চলে কোথায় যেন যাচ্ছে।

অবশেষে বাতিঘর থেকে নেমে নৌকায় উঠলাম। নৌকা গতিশীল হলো। ঘাটের দিকে ফেরত আসছি- এমন সময় হঠাৎ বৃষ্টির আগমন। সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা ছিল। ফলে আশ্চার্যান্বিত হলাম না। তবে এমন মুহূর্তে বৃষ্টির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তবু ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজতে হলো। নৌকার গতি বাড়িয়ে দিতে মাঝিকে অনুরোধ করলাম। সে বাড়িয়ে দিলো। ফাঁকে আমিও বৈঠা নিয়ে কিছুটা পথ নৌকা চালালাম।
মজার ব্যাপার হলো - ফেরত আসার পথে ঘাটের দিক থেকে আসা আরেকটি নৌকার আগমন ঘটতে দেখলাম। বনের মাঝে তাদের সাথে দেখা হলো । যাত্রীদ্বয় সম্ভবত নবদম্পতি। এদের নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে বৃদ্ধ মাঝি নৌকা চালিয়ে আসছে। মাঝির মুখে ভাটিয়ালি গান। জোর গলায় সে গান গাচ্ছে আর নৌকা চালাচ্ছে। তা দেখে আমাদের নৌকার তরুণ মাঝি হেসে দেয়। বৃদ্ধ মাঝিকে ডাক দিয়ে সিলেটি ভাষায় বলে ( যার অনুবাদ এমন ) - দাদা, নতুন বউ জামাই দেখে কি মনে আবারও বিয়ের চিন্তা উদয় হয়েছে? বৃষ্টিতে ভিজেও এতো সুর আসে কোত্থেকে?! বৃদ্ধ মাঝি হাসি দিয়ে আরও জোরে গান শুরু করে।

বৃষ্টি পড়া থেমে গেলো। আমরাও ঘাটে ফিরে এলাম। ভাড়া চুকিয়ে সিএনজির উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। হায়রে, রাস্তা এতো কর্দমাক্ত হলো কিভাবে?! জুতার তলায় কাদা জমে এক কেজির চেয়ে বেশি ওজন হয়ে গেছে। অগত্য জুতা হাতে নিয়ে সিএনজির কাছে এলাম। পাশের একটি বাড়িতে গিয়ে টিউবওয়েলের পানি দিয়ে কাদামাটি দূর করলাম। তারপর সকাল সাড়ে ৯ টার সময় আমাদের সিএনজি এবং ভৈরবের ঐ পর্যটকদলের সিএনজি একসাথে ছেড়ে দিলো।

♥ [ বাকী অংশ পরবর্তী পর্বে দেখুুন ] ♥

No comments:

Post a Comment

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Adbox