রাজা গৌড় গোবিন্দ হিল ভালোভাবে দেখতে না পেয়ে আমরা ফিরে আসি। পাশে অবস্থিত জেলা সড়ক অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় মসজিদে মাগরিবের নামায আদায় করি। নামায শেষে হেঁটে হেঁটে আবারও শাহজালালের দরগার চত্বরে ফিরে আসি। আগামীকাল জাফলং কিভাবে যাবো এই প্রসঙ্গে কথা তুলি। উমর ফারুক এবং রাশেদের কণ্ঠে অনাগ্রহ ঝরে পড়ে। তারা জাফলং যেতে তেমন আগ্রহী না। রাশেদের যুক্তি - বিছানাকান্দি আর জাফলং ছোট-ভাই, বড়-ভাইয়ের মত। দেখতে প্রায় একই রকম। পার্থক্য এতোটুকু : বিছানাকান্দি দূর থেকে ঝর্ণা দেখা লাগে ; জাফলং সরাসরি ঝর্ণার কাছে যাওয়া যায়। উভয়টিই পাথুরে ভূমি। পানিও একই রকম স্বচ্ছ। তাহলে কি দরকার যাওয়ার?! তাছাড়া বিছানাকান্দি নাকি তুলনামূলক জাফলং এর চেয়ে সুন্দর। সে আগে একবার জাফলং গেছে। তার মনে হচ্ছে - বিছানাকান্দি দেখে জাফলং না যাওয়াই উচিৎ। উমর ফারুক জাফলং না গেলেও রাশেদের সাথে সুর মিলায়। অগত্য বাধ্য হয়ে জাফলং যাওয়ার ইচ্ছা বাদ দেই। রাতেই ঢাকা ফেরার সিদ্ধান্ত নেই। রাশেদ নাকি পুনরায় শ্রীমঙ্গলে গিয়ে তার দাদার বাড়িতে যাবে। আমাকেও সাথে যেতে বারেবারে অনুরোধ করে। আমি পুনরায় শ্রীমঙ্গল যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করি। গতকালই তো সেখান থেকে আসলাম। তাছাড়া পুরো সফরটি যেহেতু পুর্ব পরিকল্পনার বিপরীত হয়েছে ; এবার ঢাকায় ফেরত যাওয়াটাও হুট করে হোক। কাকতালীয়তার ব্যপারটা পূর্ণতা পাক।
মনে বড় সান্তনা। সিলেট পুনরায় আসার পথটি বন্ধ হয় নি। জাফলং, মাধবকুণ্ডের ঝর্ণা, মায়াবতী ঝর্ণা, হামহাম ঝর্ণা ইত্যাদি দেখার জন্য হলেও আবার আসবো। অবশ্য এটি কষ্ট করে সান্তনা খোঁজার মত। জাফলং যেতে পারছি না। সরাসরি পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে ঝর্ণার স্বাদ গ্রহণ করা হলো না ইত্যাদি বিষয়গুলোর কারণে মনটা অনেক খারাপ ছিল। তখন সান্তনা খুঁজতেই উপরোক্ত ভাবনাগুলোর জন্ম দিলাম। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে কোন বিশেষ মানুষকে সাথে নিয়ে সিলেটে আবারও আসবো।
ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত যেহেতু নিয়ে ফেলেছি ; তখন দেরি করে লাভ কি?! ঢাকায় ফেরার জন্য বের হয়ে গেলাম। দরগার মূল গেইটের এক পাশে এসে দাঁড়ালাম। দরগাহেরর গেইট থেকে সিলেটের প্রধান ব্যস্ত সড়ক পর্যন্ত ২০০/৩০০ গজের পথ। এটিতে গাড়ি পার্কিং করা । দরগাহ সংক্রান্ত গাড়িগুলো এখানে অবস্থান করে। আর এই পার্কিং করা রাস্তার উভয় পাশে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল এবং রকমারি দোকানপাট। স্থানীয় চা বাগানের চা পাতা, দরগাহকে উদ্দেশ্য করে তৈরি বিশেষ সন্দেশ, ভারতীয় বিভিন্ন পন্য, নানান প্রকার আচার, ঘরের প্রসাধনী ইত্যাদিতে ভরপুর দোকানগুলো। আমরা দরগার প্রধান ফটকের পাশে অবস্থিত একটি দোকানে প্রবেশ করলাম। উদ্দেশ্য কিছু কেনাকাটা করা। বিছানাকান্দি থেকে কেনা হলো না। জাফলং যাওয়ার সুযোগ পেলাম না। এখন এখান থেকে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাই।
দোকান থেকে কয়েক পদের মিঠাই, সন্দেশ এবং আচার কিনি। আরও কিছু কেনা যায় কিনা দেখছি। এমন সময় আবারও দেখা। পরিচিত মুখটির পুনঃদর্শন। সেও এখানে কিনতে এসেছে। তবে গতকালের চেয়ে সে আজকে একেবারে ভিন্ন। প্রথমে তাকে চিনতেই পারি নি। তবে কেন জানি মনে হচ্ছিল - কোথাও যেন দেখেছি। 'কোথায় দেখেছি' চিন্তা করতে কয়েক মিনিট লেগে যায়। হ্যাঁ, শ্রীমঙ্গলে দেখেছি। গত শুক্রবার রাতে শ্রীমঙ্গলে একই সাথে প্লাটফরমে বসে রাত কাটিয়েছি। শনিবার সকালে একই রেস্টুরেন্টে নাশতা করেছি। তাইতো এতো পরিচিত মনে হচ্ছে। একদিনে এতো পরিবর্তন?! মাজারের এতো প্রভাব তার মধ্যে পড়েছে?! নাহ, মানুষ তাহলে এখনও ধর্মকে মনেপ্রাণে ভক্তি করে। যদিও তাতে কিছু ভুলভ্রান্তি হয়ে যায়। তার পরিবর্তনটা মাজার কেন্দ্রীক না হয়ে অন্য কোন সঠিক পন্থায় হলে ভালো লাগতো। তারপরও সান্তনা যে, পরিবর্তন তো দেখতে পেলাম। আহ, আমৃত্যু যদি সে এই পরিবর্তিত রূপে থাকতো !
কেনাকাটা শেষে দরগার গেইট থেকে একটি সিএনজি নিয়ে সিলেট রেলস্টেশনে আসলাম। রেলের টিকেট কাটতে লাইনে দাঁড়ালাম। কিন্তু কোন খালি সিটের টিকেট পেলাম না। দাঁড়িয়ে যাবার অবশ্য ব্যবস্থা আছে। কিন্তু রাতের বেলা দাঁড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না। যদিও দাঁড়িয়ে যাবার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। ময়মনসিংহের পুরো সফরটিই দাঁড়িয়ে করেছিলাম। তবে ঐটা দিনের বেলার সফর ছিল।
ট্রেনের টিকেট না পেয়ে বাসে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। রেলস্টেশনের পাশেই সিলেটের কেন্দ্রীয় বাসস্টেন্ড । সেখানে গেলাম। রাশেদ এখান থেকে শ্রীমঙ্গলের বাসে উঠে তার দাদার বাড়ি চলে গেলো। রাতের খাবার সে দাদার বাড়ি গিয়ে খাবে। আমার আর উমর ফারুকের যেহেতু ঢাকায় ফিরতে ফিরতে পরদিন সকাল হয়ে যাবে, তাই স্টেশনের পাশের একটি দোকানে নৈশভোজ সেরে নিলাম।
রাতের খাবার খেয়ে উমর ফারুককে বললাম - সিলেট ছেড়ে তো চলে যাচ্ছি ; আমার একটা শেষ ইচ্ছা আছে। তা হলো - সুরমা নদীর তীরে গিয়ে কয়েকটা মুহূর্ত কাটানো। তুমি কি যাবে আমার সাথে? সে রাজি হলো। তাকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে সুরমা নদীর তীরে আসলাম।
নদীর উভয় তীরে ল্যাম্পপোস্ট লাগানো। ফলে উভয় তীর বাতির আলোয় আলোকিত। সুন্দর একটি রূপে সুরমা নদী সজ্জিত। বেশ লাগলো। কতক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকলাম। তারপর উমর ফারুককে বললাম - কেন সুরমা নদীর তীরে এসেছি জানো? জবাব দিলো - নদী দেখতে। আমি বললাম - অর্ধেক বলেছ। বাকী অর্ধেক হলো - ইতিহাসটা একটু কল্পনার চোখে দেখতে । প্রায় ৭০০ বছর পূর্বের সুরমা নদীর তীরে দাঁড়াতে। এসেছি। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখেছি। কল্পনায় হিসাব মিলিয়েছি। আচ্ছা, সিলেটে শাহজালাল রহ. এর আগমন সম্পর্কে কিছু জান? উত্তর - সামান্য কিছু জানি। আমি তার থেকে অনুমতি নিয়ে সুরমার তীরে দাঁড়িয়ে অতীত সুরমা নদীর তীরের ইতিহাস বর্ণনা শুরু করি। তার কিছুটা এমন -
তেরশত শতকের কথা। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুসারে তুর্কিদের বঙ্গ বিজয়ের মধ্য দিয়ে শ্রীহট্টে মুসলমান জনবসতি গড়ে ওঠে ছিল । সিলেটের টুলটিকর মহল্লায় ও হবিগঞ্জের তরফে তৎকালে মুসলমানরা বসতি গড়েছিলেন। এ সময় শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যে গৌড়-গোবিন্দ নামে এক অত্যাচারী রাজা ছিল। রাজা গৌড় গোবিন্দ ছিলেন ধার্মিক হিন্দু। ধর্ম পালনে ছিলেন কঠোর । অন্য ধর্মের প্রতি ছিলেন খুবই অশ্রদ্ধাশীল ও অসহিঞ্চু। শ্রীহট্ট ইতিহাসে তিনি অত্যাচারী রাজা হিসাবে সর্বশ্রেষ্ঠ।
তার রাজ্যে গোহত্যা ছিল নিষিদ্ধ। গরু জবাই করা তার কাছে মানুষ হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ ছিল। এই আইন খুব কড়া ভাবে প্রয়োগ ছিল। সে সময় গৌড় রাজ্যে শহরের কাছে একটি মুসলিম পরিবার বাস করতো। ঐ পরিবারের বুরহানুদ্দীন নামক এক যুবক নতুন বিয়ে করে। বছর গড়াতে তার ঘর আলোকিত করে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। তাতে বাবা খুশিতে আটখান হয়ে পড়ে। পুত্র সন্তান জন্মের এক সপ্তাহ পর একটি বড় গরু দিয়ে আকীকা করে ছেলের নাম রাখে। রাজা গৌড় গোবিন্দ গরু জবাই বিষয়ে খুব কঠোর - এটা তাঁর জানা ছিল। ফলে রাতের অন্ধকারে গরু জবাই করে এর বর্ধিত অংশ: শিং, কান, রক্ত - সব মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখে। কিন্তু কপাল মন্দ বলে কথা। এলাকার কুকুর কাকেরা টের পেয়ে যায়। কুকুর মাটি খুঁড়ে গরুর চামড়া, কান বের করে ফেলে। ঐ সব অংশগুলোতে কাকও ভাগ বসায়। ঘটনাচক্রে একটি কাকা গরুর কান নিয়ে যাওয়ার সময় রাজ দরবারের কাছে এসে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। মুখ থেকে কানটি পড়ে যায়। আর তাতেই রাজার কানে গরু জবাইয়ের খবর পৌঁছে যায়। রাজা রেগে তেলেবেগুন হয়ে উঠে। সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে গরু জবাই করার মত দুঃসাহসকারীর খোঁজ নেয়। বুরহানুদ্দীনের বাড়ির কাছে এসে সৈন্যবাহিনী আকিকার খবর জেনে যায়।
রাজা বুরহানুদ্দীনকে রাজ দরবারে ডেকে আনে। সাথে স্ত্রী পুত্রকেও। রাজা গৌড় গোবিন্দ বুরহানুদ্দীনের কাছে গোহত্যার কারণ জানতে চায়। বুরহানুদ্দীন ইসলাম ধর্মের অন্যতম বিধান আকিকার কথাটি বলেন। এতে রাজা আরও রেগে যায়। তার রাজ্যে অন্য ধর্মের অনুশীলন চলবে না। এই অপরাধের শাস্তি হওয়া দরকার। কি শাস্তি? একটা ধারালো ছুরি আনো। বুরহানুদ্দীনের হাতে দাও। তার স্ত্রীকে বলো পুত্র সন্তানটিকে টেবিলে শোয়াতে। এবং সন্তানের মাথায় হাত রাখতে। এতে গলা টানটান হবে। জোর করে তাই করা হলো। এবং চাবুক পেটা করে বুরহানুদ্দীনকে সন্তানের গলায় ছুরি চালাতে বাধ্য করলো। "তার রাজ্যে গোহত্যার শাস্তি এভাবেই ভোগ করতে হবে" রাজা চিৎকার করে ঘোষণা দিলো।
বুরহানুদ্দীন ও তার স্ত্রী সন্তান হারিয়ে দিশেহারা। দুঃখে কষ্টে অপমানে পাগল প্রায়। তারা এর প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। সে সময় শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যের পার্শ্ববর্তী মুসলিম রাজ্যের তৎকালীন বাংলার সুলতান "শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহের" নিকট গিয়ে এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ করেন। সুলতান তাঁর ভাগ্নে় সিকান্দর গাজীকে বড় একটি সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যে প্রেরণ করেন। মুসলিম বাহিনী যখন ব্রহ্মপুত্র নদী পার হতে চেষ্টা করে, তখনই রাজা গৌড় গোবিন্দ মুসলিম সৈন্যের উপর অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করে। এবং সমস্ত চেষ্টাকে বিফল করে ফেলে। গোবিন্দের শক্তির প্রভাবে সিকান্দর গাজীর বিফল মনোরথের সংবাদ দিল্লীর সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজীর নিকট পৌঁছে। সম্রাট এ সংবাদে মর্মাহত হলেন। সম্রাট নাসিরুদ্দীন নামক একজন দ্বীনদার ব্যক্তিকে সিপাহসালার বানিয়ে সিকান্দর গাজীর কাছে প্রেরণ করেন।
এদিকে গাজী বুরহানুদ্দীন তখন দিল্লীতে অবস্থান করছিলেন। এসময় শাহজালাল রহ.ও তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে দিল্লীতে আসেন । ঐতিহাসিক আজহার উদ্দীন ধরণা করেন - দিল্লীতেই বুরহানুদ্দীনের সাথে শাহ জালালের সাক্ষাৎ হয় এবং এখানেই বুরহান উদ্দীন নিজের দুঃখময় কাহিনী তাঁর নিকট বর্ণনা করেন ।
শাহজালাল রহ. দিল্লী হতে বুরহানুদ্দীনকে সহ ২৪০ জন সঙ্গীসহচর নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্য রওয়ানা হলেন । শাহজালাল রহ. সাতগাঁও এসে ত্রিবেণীর নিকট দিল্লীর সম্রাট প্রেরিত অগ্রবাহিনীর সিপাহসালার সেনাপতি নাসিরুদ্দীনের সাথে মিলিত হন। সেনাপতি নাসিরুদ্দীন শাহজালাল রহ. সম্পর্কে অবগত হয়ে তদীয় শিষ্যত্ব গ্রহণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। পথে পথে শাহজালালের শিষ্য বাড়তে লাগে । তারা ত্রিবেণী থেকে বিহার ; বিহার হতে সোনারগাঁ অভিমুখে সিকান্দর গাজীর সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
শাহজালাল রহ. সোনারগাঁ আসা মাত্রই শাহ সিকান্দর গাজীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটলো। সিকান্দর গাজী শাহজালালকে সসম্মানে গ্রহণ করলেন । শাহজালাল রহ. তাঁর সঙ্গী অনুচর ও সৈন্যসহ শাহ সিকান্দরের শিবিরে সমাগত হয়ে সিকান্দর হতে যুদ্ধ বিষয়ে সব বিষয় অবগত হন। সিকান্দর শাহজালালের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শিষ্যগ্রহণপূর্বক সিলেট অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন। এভাবে শাহজালালের শিষ্য সংখ্যা বেড়ে ৩৬০ জনে পৌঁছায়।
এদিকে গৌড় গৌবিন্দ নিজস্ব গোয়েন্দা দ্বারা শাহজালালের সমাগম সংবাদ পেয়ে - নতুন এ দল যাতে ব্রহ্মপুত্র নদী পার না হতে পারেন, সে জন্য নদীর সমস্ত নৌ-চলাচল বন্ধ করে দেয়। শাহজালালের ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে বিনা বাধায় জায়নামাজের সাহায্যে ব্রহ্মপুত্র নদী অতিক্রম করেন।
বাহিনী সিলেটের কাছে চলে এলো। এই খবর রাজা গৌড় গোবিন্দের কানে গেলো। এতে সে প্রচুর ভয় পেয়ে যায়। আবার আশার আলোও দেখতে পায়। কারণ তার রাজ্যে আসতে হলে আরেকটি নদী পার হতে হবে। এটি উত্তাল সুরমা নদী। এই সুরমা নদী তখন এখনকার মত সরু ছিল না। তখন এটি বিশাল নদী ছিল। নৌযান ছাড়া পার হওয়ার কল্পনাও করা যেতো না। রাজা এবারও নির্দেশ দিলেন - সুরমা নদী থেকে সব ধরণের নৌযান সরিয়ে ফেলো। দেখি বেটারা কিভাবে নদী পার হয় ! কিন্তু রাজা গৌড় গোবিন্দ ভুলে যায় - কার সাথে সে পাল্লা দিচ্ছে। তার বিরোধী শক্তি এমন এক জাতির, যাদের নৌযান লাগে না। এমনিতে নদী পার হয়ে যায়। ইসলামের আদিকাল থেকে এমন ঘটনা বহু রয়েছে।
রাজার নির্দেশে সব নৌযান সরিয়ে ফেলা হয়। মুসলিম বাহিনী সুরমা নদীর তীরে এসে দেখে নৌযানশূণ্য সুরমা নদী। শাহজালাল রহ. মোটেও অবাক হলেন না। বরং পুরো বাহিনীকে পবিত্রতা অর্জন করে নামাযে দাঁড়াতে বললেন। নামায শেষে সবাইকে চূড়ান্ত হামলার উদ্দেশ্যে আল্লাহু আকবার বলে নদীর উপর পা রাখতে বললেন। তাই করা হলো। আর এমনিতেই কোনরূপ নৌযান ছাড়া নদী পার হয়ে গেলেন। এটি ওলী আউলিয়াদের কারামাত। নবীজি স. এর নবুয়্যতের অন্যতম নিদর্শন। নবীজির খাঁটি উম্মতদের থেকে কারামাত প্রকাশ পাওয়া সত্য। ইসলাম স্বীকৃত। কিসরার রাজপ্রসাদ দখল করার সময়ও সাহাবায়ে কেরাম এভাবে নদী পার হয়েছিলেন।
যাইহোক, শাহজালাল রহ. ও তাঁর বাহিনী এভাবে নদী পার হতে দেখেই রাজ্যের অর্ধেক সৈন্য পালিয়ে যায়। বাকী অর্ধেক বাহিনী এপাড়ে এসে তাকবীর ধ্বনি দিতেই উধাও হয়ে যায়। এতো বড় বুকের পাটা তাদের নেই। স্বয়ং রাজাও পালিয়ে যায়। বুরহানুদ্দীনের সন্তান হত্যার বিচার এভাবেই সুচারুরূপে কার্যকর করা হয়। এরপর থেকে শাহজালাল রহ. এবং সঙ্গী ৩৬০ জন সিলেটে থেকে যান। এখানে ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। জুলুম নির্যাতনের পথ বন্ধ করে দেন। তাইতো সিলেটের মানুষ তার এতো ভক্ত।
সুরমার তীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উমর ফারুক ইতিহাসের এই অধ্যায়টি শুনলো। আমি আরও একটু কথা এর সাথে যোগ করি। বলি - আচ্ছা, একটি ঘটনা তো তুমি শুনলে ; কিন্তু এখানে দাঁড়ানোর আরেকটি কারণ শোনবে না? বললো - হ্যাঁ অবশ্যই। আমি বললাম - আমরা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সুরমা নদীর এই অংশটির যে কোন এক স্থান দিয়ে শাহজালাল (রহ.) নদী পার হয়েছেন। মাগরিবের পর গৌড় গোবিন্দ হিলে যে গেলে, ঐ তো এই পথ দিয়েই একটু সামনে ঐটি। সুতরাং কি বুঝলে? এবার দেখি উমর ফারুক অন্য চোখে সুরমা নদীর দিকে তাকাচ্ছে। মজা করে বলে উঠে - এই নদী, তুমি এমন দৃশ্যও দেখেছ?
সুরমা নদীর দর্শন শেষে বাসস্টেন্ডে চলে আসলাম। সিলেট শহরটি আরও একটু ঘুরে দেখলাম। লিখতে লিখতে ক্লান্ত। তাই সেই গল্প আর বলবো না। ও হ্যাঁ, ক্লান্তির কথা বললাম না ; এর একটি মধুর গল্প আছে। আগে ঢাকায় ফিরি, তারপর বলবো।
রাত ১২ টার সময় সিলেট বাসস্টেন্ড থেকে সুরমা নদীর যাত্রীবাহী 'সুরমা এক্সপ্রেস' নামক বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সারারাত বাসে ঘুমিয়ে কাটালাম। পরদিন সোমবার ১০ই সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং তারিখের সকাল ৭ টা ২৫ মিনিটের সময় যাত্রাবাড়ি চৌরাস্তায় ফ্লাইওভারের নিচে বাস থেকে নামলাম।
সোমবার দিনটি ক্লাস করে, বিশ্রাম করে কেটে গেলো। মঙ্গলবারে কলম হাতে নিলাম। অনেক পৃষ্ঠা লিখেও ফেললাম। বুধবার রাত ১১ টা ২০ মিনিটের কথা। তখন আমি লিখতে লিখতে ক্লান্ত। এমন সময় আমার ক্লাসমেট, বন্ধুবর, নতুন হাজী সাহেবের আগমন। এসে আমার লেখার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস করলো। গতকাল সে চট্টগ্রাম থেকে এসে এই প্রশ্নটাই করেছিল। আজকে আবারও। তবে আজকে হাতে বোতল। মুখে হাসি। বললো - মনে হচ্ছে লিখতে লিখতে তুমি ক্লান্ত। নাও জমজমের পানি খাও। আর এই নাও মক্কার খেজুর। খেয়ে ক্লান্তি দূর করো। এগুলো বিশেষভাবে তোমার জন্য এনেছি। কাউকে জানিও না। সবাইকে দেয়ার মত অবস্থা আমার নেই। আমি সাথে সাথে তার থেকে জমজম এবং মক্কার খেজুর লুফে নিলাম। খেজুর ও জমজম খেয়ে ক্লান্তি দূর করলাম। আর আমার এই নতুন ভ্রমণবৃত্তান্ত হজ্বের ছোঁয়ায় ধন্য হলো। এই বন্ধুবর আলহাজ্ব তাকী তাইয়্যেব গত শুক্রবারে হজ্ব থেকে এসেছে। যেদিন আমরা সিলেট গিয়েছিলাম। হে আল্লাহ, আমাদেরকেও হজ্ব করার তাওফিক দান করো। আমিন।
সিলেট থেকে আসার পরদিন থেকে পরবর্তী সপ্তাহের রবিবারের ভিতর চারদিনের প্রচেষ্টায় লেখাটি পূর্ণতা পায়। মাঝে দুইদিন বিশ্রাম নেই। বিশ্রামসহ মোট ছয় দিন লাগে। এখন বিকাল ৪ টা বেজে ১৮ মিনিট। তারিখ ১৬/০৯/২০১৮ ইং রবিবার। হ্যাঁ, শেষ হয়ে গেলো সিলেট ভ্রমণবৃত্তান্ত।
মনে বড় সান্তনা। সিলেট পুনরায় আসার পথটি বন্ধ হয় নি। জাফলং, মাধবকুণ্ডের ঝর্ণা, মায়াবতী ঝর্ণা, হামহাম ঝর্ণা ইত্যাদি দেখার জন্য হলেও আবার আসবো। অবশ্য এটি কষ্ট করে সান্তনা খোঁজার মত। জাফলং যেতে পারছি না। সরাসরি পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে ঝর্ণার স্বাদ গ্রহণ করা হলো না ইত্যাদি বিষয়গুলোর কারণে মনটা অনেক খারাপ ছিল। তখন সান্তনা খুঁজতেই উপরোক্ত ভাবনাগুলোর জন্ম দিলাম। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে কোন বিশেষ মানুষকে সাথে নিয়ে সিলেটে আবারও আসবো।
ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত যেহেতু নিয়ে ফেলেছি ; তখন দেরি করে লাভ কি?! ঢাকায় ফেরার জন্য বের হয়ে গেলাম। দরগার মূল গেইটের এক পাশে এসে দাঁড়ালাম। দরগাহেরর গেইট থেকে সিলেটের প্রধান ব্যস্ত সড়ক পর্যন্ত ২০০/৩০০ গজের পথ। এটিতে গাড়ি পার্কিং করা । দরগাহ সংক্রান্ত গাড়িগুলো এখানে অবস্থান করে। আর এই পার্কিং করা রাস্তার উভয় পাশে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল এবং রকমারি দোকানপাট। স্থানীয় চা বাগানের চা পাতা, দরগাহকে উদ্দেশ্য করে তৈরি বিশেষ সন্দেশ, ভারতীয় বিভিন্ন পন্য, নানান প্রকার আচার, ঘরের প্রসাধনী ইত্যাদিতে ভরপুর দোকানগুলো। আমরা দরগার প্রধান ফটকের পাশে অবস্থিত একটি দোকানে প্রবেশ করলাম। উদ্দেশ্য কিছু কেনাকাটা করা। বিছানাকান্দি থেকে কেনা হলো না। জাফলং যাওয়ার সুযোগ পেলাম না। এখন এখান থেকে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাই।
দোকান থেকে কয়েক পদের মিঠাই, সন্দেশ এবং আচার কিনি। আরও কিছু কেনা যায় কিনা দেখছি। এমন সময় আবারও দেখা। পরিচিত মুখটির পুনঃদর্শন। সেও এখানে কিনতে এসেছে। তবে গতকালের চেয়ে সে আজকে একেবারে ভিন্ন। প্রথমে তাকে চিনতেই পারি নি। তবে কেন জানি মনে হচ্ছিল - কোথাও যেন দেখেছি। 'কোথায় দেখেছি' চিন্তা করতে কয়েক মিনিট লেগে যায়। হ্যাঁ, শ্রীমঙ্গলে দেখেছি। গত শুক্রবার রাতে শ্রীমঙ্গলে একই সাথে প্লাটফরমে বসে রাত কাটিয়েছি। শনিবার সকালে একই রেস্টুরেন্টে নাশতা করেছি। তাইতো এতো পরিচিত মনে হচ্ছে। একদিনে এতো পরিবর্তন?! মাজারের এতো প্রভাব তার মধ্যে পড়েছে?! নাহ, মানুষ তাহলে এখনও ধর্মকে মনেপ্রাণে ভক্তি করে। যদিও তাতে কিছু ভুলভ্রান্তি হয়ে যায়। তার পরিবর্তনটা মাজার কেন্দ্রীক না হয়ে অন্য কোন সঠিক পন্থায় হলে ভালো লাগতো। তারপরও সান্তনা যে, পরিবর্তন তো দেখতে পেলাম। আহ, আমৃত্যু যদি সে এই পরিবর্তিত রূপে থাকতো !
কেনাকাটা শেষে দরগার গেইট থেকে একটি সিএনজি নিয়ে সিলেট রেলস্টেশনে আসলাম। রেলের টিকেট কাটতে লাইনে দাঁড়ালাম। কিন্তু কোন খালি সিটের টিকেট পেলাম না। দাঁড়িয়ে যাবার অবশ্য ব্যবস্থা আছে। কিন্তু রাতের বেলা দাঁড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না। যদিও দাঁড়িয়ে যাবার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। ময়মনসিংহের পুরো সফরটিই দাঁড়িয়ে করেছিলাম। তবে ঐটা দিনের বেলার সফর ছিল।
ট্রেনের টিকেট না পেয়ে বাসে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। রেলস্টেশনের পাশেই সিলেটের কেন্দ্রীয় বাসস্টেন্ড । সেখানে গেলাম। রাশেদ এখান থেকে শ্রীমঙ্গলের বাসে উঠে তার দাদার বাড়ি চলে গেলো। রাতের খাবার সে দাদার বাড়ি গিয়ে খাবে। আমার আর উমর ফারুকের যেহেতু ঢাকায় ফিরতে ফিরতে পরদিন সকাল হয়ে যাবে, তাই স্টেশনের পাশের একটি দোকানে নৈশভোজ সেরে নিলাম।
রাতের খাবার খেয়ে উমর ফারুককে বললাম - সিলেট ছেড়ে তো চলে যাচ্ছি ; আমার একটা শেষ ইচ্ছা আছে। তা হলো - সুরমা নদীর তীরে গিয়ে কয়েকটা মুহূর্ত কাটানো। তুমি কি যাবে আমার সাথে? সে রাজি হলো। তাকে নিয়ে হেঁটে হেঁটে সুরমা নদীর তীরে আসলাম।
নদীর উভয় তীরে ল্যাম্পপোস্ট লাগানো। ফলে উভয় তীর বাতির আলোয় আলোকিত। সুন্দর একটি রূপে সুরমা নদী সজ্জিত। বেশ লাগলো। কতক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকলাম। তারপর উমর ফারুককে বললাম - কেন সুরমা নদীর তীরে এসেছি জানো? জবাব দিলো - নদী দেখতে। আমি বললাম - অর্ধেক বলেছ। বাকী অর্ধেক হলো - ইতিহাসটা একটু কল্পনার চোখে দেখতে । প্রায় ৭০০ বছর পূর্বের সুরমা নদীর তীরে দাঁড়াতে। এসেছি। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখেছি। কল্পনায় হিসাব মিলিয়েছি। আচ্ছা, সিলেটে শাহজালাল রহ. এর আগমন সম্পর্কে কিছু জান? উত্তর - সামান্য কিছু জানি। আমি তার থেকে অনুমতি নিয়ে সুরমার তীরে দাঁড়িয়ে অতীত সুরমা নদীর তীরের ইতিহাস বর্ণনা শুরু করি। তার কিছুটা এমন -
তেরশত শতকের কথা। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুসারে তুর্কিদের বঙ্গ বিজয়ের মধ্য দিয়ে শ্রীহট্টে মুসলমান জনবসতি গড়ে ওঠে ছিল । সিলেটের টুলটিকর মহল্লায় ও হবিগঞ্জের তরফে তৎকালে মুসলমানরা বসতি গড়েছিলেন। এ সময় শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যে গৌড়-গোবিন্দ নামে এক অত্যাচারী রাজা ছিল। রাজা গৌড় গোবিন্দ ছিলেন ধার্মিক হিন্দু। ধর্ম পালনে ছিলেন কঠোর । অন্য ধর্মের প্রতি ছিলেন খুবই অশ্রদ্ধাশীল ও অসহিঞ্চু। শ্রীহট্ট ইতিহাসে তিনি অত্যাচারী রাজা হিসাবে সর্বশ্রেষ্ঠ।
তার রাজ্যে গোহত্যা ছিল নিষিদ্ধ। গরু জবাই করা তার কাছে মানুষ হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ ছিল। এই আইন খুব কড়া ভাবে প্রয়োগ ছিল। সে সময় গৌড় রাজ্যে শহরের কাছে একটি মুসলিম পরিবার বাস করতো। ঐ পরিবারের বুরহানুদ্দীন নামক এক যুবক নতুন বিয়ে করে। বছর গড়াতে তার ঘর আলোকিত করে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। তাতে বাবা খুশিতে আটখান হয়ে পড়ে। পুত্র সন্তান জন্মের এক সপ্তাহ পর একটি বড় গরু দিয়ে আকীকা করে ছেলের নাম রাখে। রাজা গৌড় গোবিন্দ গরু জবাই বিষয়ে খুব কঠোর - এটা তাঁর জানা ছিল। ফলে রাতের অন্ধকারে গরু জবাই করে এর বর্ধিত অংশ: শিং, কান, রক্ত - সব মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখে। কিন্তু কপাল মন্দ বলে কথা। এলাকার কুকুর কাকেরা টের পেয়ে যায়। কুকুর মাটি খুঁড়ে গরুর চামড়া, কান বের করে ফেলে। ঐ সব অংশগুলোতে কাকও ভাগ বসায়। ঘটনাচক্রে একটি কাকা গরুর কান নিয়ে যাওয়ার সময় রাজ দরবারের কাছে এসে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। মুখ থেকে কানটি পড়ে যায়। আর তাতেই রাজার কানে গরু জবাইয়ের খবর পৌঁছে যায়। রাজা রেগে তেলেবেগুন হয়ে উঠে। সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে গরু জবাই করার মত দুঃসাহসকারীর খোঁজ নেয়। বুরহানুদ্দীনের বাড়ির কাছে এসে সৈন্যবাহিনী আকিকার খবর জেনে যায়।
রাজা বুরহানুদ্দীনকে রাজ দরবারে ডেকে আনে। সাথে স্ত্রী পুত্রকেও। রাজা গৌড় গোবিন্দ বুরহানুদ্দীনের কাছে গোহত্যার কারণ জানতে চায়। বুরহানুদ্দীন ইসলাম ধর্মের অন্যতম বিধান আকিকার কথাটি বলেন। এতে রাজা আরও রেগে যায়। তার রাজ্যে অন্য ধর্মের অনুশীলন চলবে না। এই অপরাধের শাস্তি হওয়া দরকার। কি শাস্তি? একটা ধারালো ছুরি আনো। বুরহানুদ্দীনের হাতে দাও। তার স্ত্রীকে বলো পুত্র সন্তানটিকে টেবিলে শোয়াতে। এবং সন্তানের মাথায় হাত রাখতে। এতে গলা টানটান হবে। জোর করে তাই করা হলো। এবং চাবুক পেটা করে বুরহানুদ্দীনকে সন্তানের গলায় ছুরি চালাতে বাধ্য করলো। "তার রাজ্যে গোহত্যার শাস্তি এভাবেই ভোগ করতে হবে" রাজা চিৎকার করে ঘোষণা দিলো।
বুরহানুদ্দীন ও তার স্ত্রী সন্তান হারিয়ে দিশেহারা। দুঃখে কষ্টে অপমানে পাগল প্রায়। তারা এর প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। সে সময় শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যের পার্শ্ববর্তী মুসলিম রাজ্যের তৎকালীন বাংলার সুলতান "শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহের" নিকট গিয়ে এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ করেন। সুলতান তাঁর ভাগ্নে় সিকান্দর গাজীকে বড় একটি সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে শ্রীহট্টের গৌড় রাজ্যে প্রেরণ করেন। মুসলিম বাহিনী যখন ব্রহ্মপুত্র নদী পার হতে চেষ্টা করে, তখনই রাজা গৌড় গোবিন্দ মুসলিম সৈন্যের উপর অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করে। এবং সমস্ত চেষ্টাকে বিফল করে ফেলে। গোবিন্দের শক্তির প্রভাবে সিকান্দর গাজীর বিফল মনোরথের সংবাদ দিল্লীর সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজীর নিকট পৌঁছে। সম্রাট এ সংবাদে মর্মাহত হলেন। সম্রাট নাসিরুদ্দীন নামক একজন দ্বীনদার ব্যক্তিকে সিপাহসালার বানিয়ে সিকান্দর গাজীর কাছে প্রেরণ করেন।
এদিকে গাজী বুরহানুদ্দীন তখন দিল্লীতে অবস্থান করছিলেন। এসময় শাহজালাল রহ.ও তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে দিল্লীতে আসেন । ঐতিহাসিক আজহার উদ্দীন ধরণা করেন - দিল্লীতেই বুরহানুদ্দীনের সাথে শাহ জালালের সাক্ষাৎ হয় এবং এখানেই বুরহান উদ্দীন নিজের দুঃখময় কাহিনী তাঁর নিকট বর্ণনা করেন ।
শাহজালাল রহ. দিল্লী হতে বুরহানুদ্দীনকে সহ ২৪০ জন সঙ্গীসহচর নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্য রওয়ানা হলেন । শাহজালাল রহ. সাতগাঁও এসে ত্রিবেণীর নিকট দিল্লীর সম্রাট প্রেরিত অগ্রবাহিনীর সিপাহসালার সেনাপতি নাসিরুদ্দীনের সাথে মিলিত হন। সেনাপতি নাসিরুদ্দীন শাহজালাল রহ. সম্পর্কে অবগত হয়ে তদীয় শিষ্যত্ব গ্রহণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। পথে পথে শাহজালালের শিষ্য বাড়তে লাগে । তারা ত্রিবেণী থেকে বিহার ; বিহার হতে সোনারগাঁ অভিমুখে সিকান্দর গাজীর সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
শাহজালাল রহ. সোনারগাঁ আসা মাত্রই শাহ সিকান্দর গাজীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটলো। সিকান্দর গাজী শাহজালালকে সসম্মানে গ্রহণ করলেন । শাহজালাল রহ. তাঁর সঙ্গী অনুচর ও সৈন্যসহ শাহ সিকান্দরের শিবিরে সমাগত হয়ে সিকান্দর হতে যুদ্ধ বিষয়ে সব বিষয় অবগত হন। সিকান্দর শাহজালালের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শিষ্যগ্রহণপূর্বক সিলেট অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন। এভাবে শাহজালালের শিষ্য সংখ্যা বেড়ে ৩৬০ জনে পৌঁছায়।
এদিকে গৌড় গৌবিন্দ নিজস্ব গোয়েন্দা দ্বারা শাহজালালের সমাগম সংবাদ পেয়ে - নতুন এ দল যাতে ব্রহ্মপুত্র নদী পার না হতে পারেন, সে জন্য নদীর সমস্ত নৌ-চলাচল বন্ধ করে দেয়। শাহজালালের ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে বিনা বাধায় জায়নামাজের সাহায্যে ব্রহ্মপুত্র নদী অতিক্রম করেন।
বাহিনী সিলেটের কাছে চলে এলো। এই খবর রাজা গৌড় গোবিন্দের কানে গেলো। এতে সে প্রচুর ভয় পেয়ে যায়। আবার আশার আলোও দেখতে পায়। কারণ তার রাজ্যে আসতে হলে আরেকটি নদী পার হতে হবে। এটি উত্তাল সুরমা নদী। এই সুরমা নদী তখন এখনকার মত সরু ছিল না। তখন এটি বিশাল নদী ছিল। নৌযান ছাড়া পার হওয়ার কল্পনাও করা যেতো না। রাজা এবারও নির্দেশ দিলেন - সুরমা নদী থেকে সব ধরণের নৌযান সরিয়ে ফেলো। দেখি বেটারা কিভাবে নদী পার হয় ! কিন্তু রাজা গৌড় গোবিন্দ ভুলে যায় - কার সাথে সে পাল্লা দিচ্ছে। তার বিরোধী শক্তি এমন এক জাতির, যাদের নৌযান লাগে না। এমনিতে নদী পার হয়ে যায়। ইসলামের আদিকাল থেকে এমন ঘটনা বহু রয়েছে।
রাজার নির্দেশে সব নৌযান সরিয়ে ফেলা হয়। মুসলিম বাহিনী সুরমা নদীর তীরে এসে দেখে নৌযানশূণ্য সুরমা নদী। শাহজালাল রহ. মোটেও অবাক হলেন না। বরং পুরো বাহিনীকে পবিত্রতা অর্জন করে নামাযে দাঁড়াতে বললেন। নামায শেষে সবাইকে চূড়ান্ত হামলার উদ্দেশ্যে আল্লাহু আকবার বলে নদীর উপর পা রাখতে বললেন। তাই করা হলো। আর এমনিতেই কোনরূপ নৌযান ছাড়া নদী পার হয়ে গেলেন। এটি ওলী আউলিয়াদের কারামাত। নবীজি স. এর নবুয়্যতের অন্যতম নিদর্শন। নবীজির খাঁটি উম্মতদের থেকে কারামাত প্রকাশ পাওয়া সত্য। ইসলাম স্বীকৃত। কিসরার রাজপ্রসাদ দখল করার সময়ও সাহাবায়ে কেরাম এভাবে নদী পার হয়েছিলেন।
যাইহোক, শাহজালাল রহ. ও তাঁর বাহিনী এভাবে নদী পার হতে দেখেই রাজ্যের অর্ধেক সৈন্য পালিয়ে যায়। বাকী অর্ধেক বাহিনী এপাড়ে এসে তাকবীর ধ্বনি দিতেই উধাও হয়ে যায়। এতো বড় বুকের পাটা তাদের নেই। স্বয়ং রাজাও পালিয়ে যায়। বুরহানুদ্দীনের সন্তান হত্যার বিচার এভাবেই সুচারুরূপে কার্যকর করা হয়। এরপর থেকে শাহজালাল রহ. এবং সঙ্গী ৩৬০ জন সিলেটে থেকে যান। এখানে ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। জুলুম নির্যাতনের পথ বন্ধ করে দেন। তাইতো সিলেটের মানুষ তার এতো ভক্ত।
সুরমার তীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উমর ফারুক ইতিহাসের এই অধ্যায়টি শুনলো। আমি আরও একটু কথা এর সাথে যোগ করি। বলি - আচ্ছা, একটি ঘটনা তো তুমি শুনলে ; কিন্তু এখানে দাঁড়ানোর আরেকটি কারণ শোনবে না? বললো - হ্যাঁ অবশ্যই। আমি বললাম - আমরা এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সুরমা নদীর এই অংশটির যে কোন এক স্থান দিয়ে শাহজালাল (রহ.) নদী পার হয়েছেন। মাগরিবের পর গৌড় গোবিন্দ হিলে যে গেলে, ঐ তো এই পথ দিয়েই একটু সামনে ঐটি। সুতরাং কি বুঝলে? এবার দেখি উমর ফারুক অন্য চোখে সুরমা নদীর দিকে তাকাচ্ছে। মজা করে বলে উঠে - এই নদী, তুমি এমন দৃশ্যও দেখেছ?
সুরমা নদীর দর্শন শেষে বাসস্টেন্ডে চলে আসলাম। সিলেট শহরটি আরও একটু ঘুরে দেখলাম। লিখতে লিখতে ক্লান্ত। তাই সেই গল্প আর বলবো না। ও হ্যাঁ, ক্লান্তির কথা বললাম না ; এর একটি মধুর গল্প আছে। আগে ঢাকায় ফিরি, তারপর বলবো।
রাত ১২ টার সময় সিলেট বাসস্টেন্ড থেকে সুরমা নদীর যাত্রীবাহী 'সুরমা এক্সপ্রেস' নামক বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। সারারাত বাসে ঘুমিয়ে কাটালাম। পরদিন সোমবার ১০ই সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং তারিখের সকাল ৭ টা ২৫ মিনিটের সময় যাত্রাবাড়ি চৌরাস্তায় ফ্লাইওভারের নিচে বাস থেকে নামলাম।
সোমবার দিনটি ক্লাস করে, বিশ্রাম করে কেটে গেলো। মঙ্গলবারে কলম হাতে নিলাম। অনেক পৃষ্ঠা লিখেও ফেললাম। বুধবার রাত ১১ টা ২০ মিনিটের কথা। তখন আমি লিখতে লিখতে ক্লান্ত। এমন সময় আমার ক্লাসমেট, বন্ধুবর, নতুন হাজী সাহেবের আগমন। এসে আমার লেখার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস করলো। গতকাল সে চট্টগ্রাম থেকে এসে এই প্রশ্নটাই করেছিল। আজকে আবারও। তবে আজকে হাতে বোতল। মুখে হাসি। বললো - মনে হচ্ছে লিখতে লিখতে তুমি ক্লান্ত। নাও জমজমের পানি খাও। আর এই নাও মক্কার খেজুর। খেয়ে ক্লান্তি দূর করো। এগুলো বিশেষভাবে তোমার জন্য এনেছি। কাউকে জানিও না। সবাইকে দেয়ার মত অবস্থা আমার নেই। আমি সাথে সাথে তার থেকে জমজম এবং মক্কার খেজুর লুফে নিলাম। খেজুর ও জমজম খেয়ে ক্লান্তি দূর করলাম। আর আমার এই নতুন ভ্রমণবৃত্তান্ত হজ্বের ছোঁয়ায় ধন্য হলো। এই বন্ধুবর আলহাজ্ব তাকী তাইয়্যেব গত শুক্রবারে হজ্ব থেকে এসেছে। যেদিন আমরা সিলেট গিয়েছিলাম। হে আল্লাহ, আমাদেরকেও হজ্ব করার তাওফিক দান করো। আমিন।
সিলেট থেকে আসার পরদিন থেকে পরবর্তী সপ্তাহের রবিবারের ভিতর চারদিনের প্রচেষ্টায় লেখাটি পূর্ণতা পায়। মাঝে দুইদিন বিশ্রাম নেই। বিশ্রামসহ মোট ছয় দিন লাগে। এখন বিকাল ৪ টা বেজে ১৮ মিনিট। তারিখ ১৬/০৯/২০১৮ ইং রবিবার। হ্যাঁ, শেষ হয়ে গেলো সিলেট ভ্রমণবৃত্তান্ত।



No comments:
Post a Comment
Note: Only a member of this blog may post a comment.