হঠাৎ করেই দাওয়াতটা পেলাম। প্রথমে "হ্যাঁ, না" কিছুই বললাম না। পরবর্তীতে সম্মতি দিলাম। হ্যাঁ যাওয়া যেতে পারে। তোর অনুষ্ঠানে আমরা যাবো না ; তা কি হয়? আমরা সময় তোর অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে যাবো। দাওয়াতটা সহপাঠী বন্ধুবর 'আনিস' দিয়েছিল ; তার গ্রামে বাড়ি ময়মনসিংহে। তারা এমনিতে ঢাকার উত্তরায় থাকে। সেখানে নিজস্ব ছয় তলা বাসা আছে। প্রতিবছর চার / পাঁচবার গ্রামের বাড়িতে যায়। এর মধ্যে আনিসের একটু বেশিই যাওয়া পড়ে। তার গ্রামের বাড়িতে একটি মাদরাসা আছে। এই বয়সে সে ঐ মাদরাসার প্রিন্সিপাল। প্রবাদ আছে - 'বনে বাঘ না থাকলে শিয়ালই হয় রাজা'। তার অবস্থাও তেমন। তার বাড়ির আশেপাশে কয়েক এলাকাজুড়ে কোন শিক্ষিত ছেলে নেই। যা কয়েকজন পড়ুয়া ছেলেমেয়ে আছে, তাদের দৌড় প্রাইমারি পর্যন্ত। এরপর যে যার রিযিকের তালাশে বেরিয়ে পড়ে। আনিসদের পরিবার শহরে থাকার কারণে তারা শিক্ষার আলো দেখতে পেয়েছে। তাছাড়া গ্রামেও তাদের অবস্থান বিশাল। বলা যেতে পারে জমিদারের মতই তারা গ্রামে প্রভাবশালী। সব মিলিয়ে বনের পরিস্থিতি শিয়ালকেই বাঘের স্থান দখল করতে সুযোগ করে দেয়। যে ছেলে এখনও আমাদের সাথে একই ক্লাসে পড়ে, সে কিনা আবার প্রিন্সিপাল ! তাও যদি সে প্রথম সারির ছাত্র হতো ! তাকে দেখলে মাঝেমাঝে হাসতে মন চায় ; মাঝেমাঝে গুরুগম্ভীর্য হতে হয়।
যাইহোক, আনিস আমাকে এবং বুরহান ও এনামকে বিশেষভাবে বিশেষ ভঙ্গিতে তার অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিলো। সেই সাথে তার গ্রামের বাড়িতে দুই/তিন দিন বেড়ানোর আবদার। ও হ্যাঁ, উক্ত অনুষ্ঠানে কিন্তু আরেক সহপাঠী বন্ধুবর "তাওহিদ জামিলকেও" দাওয়াত দিয়েছে। তবে সে কলবরের শিল্পী হিসাবে গিয়ে অনুষ্ঠান মাতাবে। আমাদের সাথেই তার যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে পরে যায়।
শীতকালের দাওয়াত এটি। শোনেছি উত্তরবঙ্গে প্রচুর শীত পড়ে। যা ঢাকা বা কুমিল্লায় কল্পনা করা যায় না। বাস্তবেও তাই দেখেছি। এজন্য শীত থেকে বাঁচতে সতর্কতা স্বরূপ কিছু বাড়তি গরম পোশাক কিনি। যাত্রার তিন-চার দিন আগ থেকেই প্রস্তুতির পর্ব শুরু করি। শেষ পর্যন্ত যাত্রার দিনটি চলে এলো।
মজার ব্যাপার হলো - অনুষ্ঠানের এই দাওয়াতটি 'বিশ্ব ইজতেমার' ছুটিতে পড়েছে। আমরা প্ল্যান করেছি দুই-একদিন ইজতেমার মাঠে থাকবো। তারপর সেখান থেকেই ট্রেনের মাধ্যমে ময়মনসিংহ যাবো। সিদ্ধান্তক্রমে ইজতেমার মাঠে গিয়ে একদিন থাকলাম। উদ্বোধনীয় বয়ান শুনলাম। ইজতেমার মাঠের সাথে আমার কেমন যেন একটা সম্পর্ক হয়ে গেছে। প্রায় প্রত্যেক বছর একদিনের জন্যও হলেও আসতে হয়। বিগত ছয়/সাত বছর যাবৎ নিয়মিত আসা হচ্ছে। এবারও ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি। এবারের আগমনে অবশ্য বাড়তি একটা প্রাপ্তিও রয়েছে। ইজতেমার মাঠে আগমনের দ্বিতীয় দিন সৌদি আরবের বিখ্যাত মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শায়েখের সাথে একান্তে ২ ঘণ্টা সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে। তাদের আরবীয় আতিথ্যে আমি সিক্ত হয়েছি। ভাঙা ভাঙা আরবিতে তাদের সাথে কথা বলেছি। কোন আরব শায়েখের সাথে এই প্রথম আমার একান্ত আলাপন। এমন সুযোগ পাবো বলে কল্পনা করি নি। কিন্তু হয়ে গেলো। ইজতেমার মাঠে বরুড়া মাদরাসায় অধ্যয়নরত আমার পূর্ব পরিচিত এক ছাত্রের সাথে দেখা হয়। তার মাধ্যমেই মূলত এই সুযোগ পাই। তার খালাতো ভাই বিশ্ব ইজতেমায় আগত বিদেশি মেহমানদের খিদমতে ছিল। আমরা তার সেই খালাতো ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাই। আর এতেই...
ইজতেমার মাঠে দিনটি কাটিয়ে রাতে কাফরুলে অবস্থিত মামার বাসায় এলাম। বুরহান এবং এনাম তখনও মাঠে থেকে যায়। মাঠ থেকে তারা সরাসরি বিমানবন্দর রেলস্টেশনে আসবে। তারপর একসাথে রেলে করে ময়মনসিংহ যাবো।
ইজতেমার মাঠ থেকে এসে পরের দিনটা বাসায় কাটালাম। রাতে ময়মনসিংহ যাওয়া নিয়ে আমার লেখা সঙ্গীতটি পুনঃসম্পাদনা করলাম। কলবরের শিল্পী বন্ধুবর তাওহিদ এটা ময়মনসিংহ গিয়ে গাইবে। তবে তা স্টেইজে গাইবে না। ক্যামেরার সামনে। আমরা তিনজন তাতে ক্যামেরাবন্দী হবো। স্টেইজে না গাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো - এটি একটি বিনোদনপূর্ণ সঙ্গীত। এর কথা ও সুর মাহফিলের স্টেইজে মানানসই হবে না। তাছাড়া এতে ময়মনসিংহ জেলার বৈশিষ্ট্য নিয়ে ঠাট্টা করেছি। আনিস বিষয়টা জানে। ঢাকায় থাকতে লেখাটি তাকে দেখিয়েছি। সেও বিষয়টা নিয়ে বেশ মজা করেছে। যদিও তার পৈতৃকভূমি নিয়ে ঠাট্টা।
পরদিন ১৬ই জানুয়ারি ২০১৬ ইং শনিবার। আমি ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে পৌঁছলাম। কিন্তু তাদের দু'জনের দেখা নেই। অথচ প্ল্যান ছিল সকাল ৯ টার ট্রেনই আমরা ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে চলতে থাকবো। তাদের হলোটা কি? এখন ৯ টা গড়িয়ে সাড়ে নয়টা ছুঁইছুঁই। কল দিলাম। বলছে - এই তো এসে গেছি।
সকাল ১০ টার সময় তাদের আগমন ঘটে। দেখেই খুব বিরক্তি প্রকাশ করলাম। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি। যার প্রতিটি সেকেন্ড এক একটি ঘণ্টা মনে হয়েছে। "অপেক্ষা মৃত্যুর চেয়েও কঠিন" প্রবাদটি তখন সত্যিই মনে হয়েছে। যাক, এখন তো এসেছে ! যদি আরও দেরি করতো !
বিমানবান্দর রেলস্টেশনে প্রবেশ করলাম। টিকেট কাটতে কাউন্টারে গেলাম। নাহ, তাৎক্ষণিকের কোন টিকেট নেই। আনিসকে উপায় জিজ্ঞাস করলাম। সে বললো - ঢাকা শহরে যেভাবে বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাও, এভাবে ট্রেনে দাঁড়িয়ে চলে এসো। দুই ঘণ্টা লাগবে। তবে ঢাকা ভিতর দাঁড়িয়ে বাস চড়তে যতটা বিরক্ত লাগে, ট্রেনে দাঁড়িয়ে ততোটাই মজা পাবে। টিকেট চেক করার সময় টিটির হাতে কিছু ধরিয়ে দিলেই হবে। কোন সমস্যা হবে না। উৎসাহ পেয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করলাম। সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে কমলাপুর থেকে ময়মনসিংহগামী ট্রেন এলো। আমরা তাতে উঠে গেলাম।
ট্রেন ঢাকা ছেড়ে ময়মনসিংহের দিকে চলতে থাকে। আনিসকে সংবাদটা জানালাম। সে বললো - ময়মনসিংহ শহরে যাওয়ার দরকার নেই। তার আগের স্টেশন গফরগাঁও নেমে যাবে। সেখান থেকে অটো বা সিএনজি যোগে বাড়ি চলে আসবে। স্টেশনে এসে কল দিও। বাকী পথটা আসার প্রদ্ধতি তখন বলে দেবো।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেনের ভ্রমণ মন্দ লাগে নি। নতুন কয়েকটি অভিজ্ঞতা অর্জন হলো। এটিই আমার প্রথম ট্রেনে দূরপাল্লার সফর। ট্রেনে অবশ্য ইতোমধ্যে কয়েকবার চড়া হয়েছে। তা শুধু ঢাকার ভেতরেই। ঢাকার বাইরে এই প্রথম দূরে কোথাও ট্রেনে যাচ্ছি। এক বগি থেকে হেঁটে আরেক বগি ; এভাবে ভালোই মজা হলো। অবশেষে দুপুর দুইটা কিংবা আড়াইটার সময় গফরগাঁও স্টেশনে এসে নামি।
আনিসকে কল করে পরবর্তী উপায় জিজ্ঞাস করলাম। সে গফরগাঁও স্টেশনের কাছ থেকে রিকশা নিয়ে দেওয়ানগঞ্জ বাজার, সেখান থেকে অটো বা সিএনজি দিয়ে রাজাবাড়িয়া বাজারে আসতে বললো। আমরা তাই করলাম। আসার পথে ব্রহ্মপুত্র নদীর দেখা পেলাম। নদীটির উপর অনেক সুন্দর একটি ব্রিজ। ব্রিজটি দেখতে বেশ লাগলো। তবে নদীর দিকে তাকিয়ে খুব খারাপ লেগেছে। এক সময়ের দাপুটে নদী এখন মৃতপ্রায়। ব্রিজের প্রয়োজন মনে হলো আর কয়েকবছর পর লাগবে না।
রাজাবাড়িয়া বাজারে এসে আনিসের দুই ভাগ্নের দেখা পেলাম। ওরা আনিসের তত্ত্বাবধানে আমাদের লালামাটিয়া মাদরাসায় পড়ে। এই সুবাধে তারা পূর্বপরিচিত। ফলে আনিসকে পুনরায় বিরক্ত না করে ভাগ্নেদ্বয়ের সাথে বাড়ি চলে আসলাম। আনিসের বৃদ্ধ বাবার সাথে দেখা হলো। প্রথমে চিনতেই পারি নি। শহুরে মানুষ হিসাবে একটু গোছালো টাইপের হবে ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু এ দেখি পুরো গ্রাম্য কৃষকের ভাব। আনিসকে এর কারণ জিজ্ঞাস করাতে বলে - তার বাবা তার ছোটবেলার পুরনো অভ্যাস এই জীবনে বখনও ছাড়তে পারে নি। যদিও ঢাকায় চাকরিবাকরি করেছে এবং উত্তরায় বাড়ি করে থেকেও গেছে।
দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিলাম। মাগরিবের আগ মুহূর্তে হাঁটতে বের হলাম। হাড় কাঁপানো শীতের কথা অনেক শুনেছি। কখনও সরাসরি উপলব্ধি করি নি। করার সুযোগও হয় নি। কুমিল্লা বা ঢাকার শীত চামড়ার উপরেই শেষ হয়ে যায়। হাড়ে পৌঁছার সুযোগ পায় না। এখানে এসে ডবল পোশাক পরেও হাড়ে শীতের উপস্থিতি টের পাই। কুয়াশার প্রচুরতায় নিজের হাতটিও অচেনা মনে হয়। রাত যত বাড়ছে, শীতের আক্রমণ ততো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এমন শীতের মুখোমুখি এই প্রথম।
অনেকক্ষণ হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে রাজাবাড়িয়া বাজারে এলাম। একটা চায়ের দোকানে ঢুকলাম। চায়ের অর্ডার দিলাম। চা চলে এলো। ধূমায়িত গরম চা। প্রচণ্ড শীতের মাঝে একটুখানি গরমের পরশ। আহ, কি শান্তি ! মজা করে এক কাপ খেলাম। আনিস বললো - এখানে চায়ের দাম কাপ প্রতি এক টাকা বা দুই টাকা করে। যত পারো খাও। এরকম সস্তা দামে এমন ভালো দুধ চা আর কোথাও পাবে না। হ্যাঁ তাইতো ; এমনটা আর কোথায় পাবো?! এখানে নাকি গরুর খাঁটি দুধের দাম কেজি প্রতি ৩০/৩৫ টাকা করে। এতো সস্তা ! আমরা চান্স পেয়ে পাঁচ-ছয় কাপ চা এবং এক গ্লাস করে দুধ খাই। এতে দোকানিকে দেখি ভিন্ন চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। এভাবে তাকানোর রহস্য বুঝতে পারলাম না। সস্তা দামে ভালো জিনিস পেলে কি আর কেউ ছাড়ে !
চা খেয়ে বাইরে থাকা আর সম্ভব হলো না। বাড়ি ফিরে আসলাম। দরজা আটকে শীতের আক্রমণ থেকে বাঁচতে চেষ্টা করলাম। হুম, অনেকটা সফল হলাম। কম্বল গায়ে দিয়ে বসতেই বেশ আরামবোধ হলো। এদিকে বন্ধুবর তাওহিদ জামিল করলো আরেক কাহিনী। সে আসার কথা ছিল আগামীকাল। এখন কল দিয়ে বলছে - আমি নরসিংদী থেকে রওয়ানা দিয়ে অনেকটা পথ চলে এসেছি। বাকী পথের গাড়ি পাচ্ছি না। আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাও। তাওহিদের কল পেয়ে আনিস পড়লো মহাবিপদে। এই শীতের রাতে তাওহিদকে এগিয়ে আনবে কিভাবে? গাড়ি পাবে কোথায়?! কয়েক জায়গায় কল দিয়ে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত বহু কষ্ট করে বেচারা একটি মোটর সাইকেল সংগ্রহ করে। এবং তাওহিদকে এগিয়ে নিয়ে আসে।
শীত দেখে রাতের বেলা বাইরে বের হওয়ার আর তেমন সাহস পেলাম না। তবু বাধ্য হয়ে একবার বের হয়েছি। বের হতেই একঝাঁক কুয়াশা এসে আমাকে ঝাপটে ধরে। কাঁপতে কাঁপতে বেহাল হয়ে পড়ি। মনে হলো তুষার পড়ছে। অথচ আমি জানি বাংলাদেশে তুষার পড়ে না। ভাবলাম - তুষার যে সব দেশে পড়ে, তাদের জানি কি অবস্থা ! আল্লাহ, সবাই তুমি ঠাণ্ডার খারাপ প্রভাব থেকে রক্ষা করো। আমিন।
তুষারসম এই কুয়াশার ঝাপটা থেকে বাঁচতে ঘরে ফিরছিলাম - হঠাৎ দেখি একটা কুকুর দরজায় বসে আছে। কুকুর দেখে ভয় পেয়ে যাই। আমি একটু কুকুর ভীতু টাইপের মানুষ। কুকুরকে সিরিয়াস ভয় করি। ফলে দরজার দিকে আগাতে ভয় পাচ্ছিলাম। দূর থেকে আনিস বিষয়টি লক্ষ্য করে। তাই এগিয়ে এসে অভয় দেখায়। বলে - এটা শিকারি কুকুর। কিচ্ছু করবে না। রাতে এটা আমাদের বাড়ি পাহারা দেয়। কাছ আস। দেখবে - দিনের বেলা আমার সাথে তোমাকে দেখার কারণে কিভাবে লেজ নেড়ে স্বাগত জানায়। সত্যিই লেজ নেড়ে স্বাগত জানালো।
রাতে খাবার খেয়ে শোয়ে পড়ি। পরদিন ১৭/০১/২০১৬ ইং রবিবার। ভোরবেলা নাশতা করে প্রাতঃভ্রমণে বের হলাম। আশেপাশের দুইটা গ্রাম ঘুরে দেখলাম। নতুন জায়গা ; যা দেখি তাই ভালো লাগে। এই প্রাতঃভ্রমণের এক জায়গায় এসে আনিস বললো - এখানে যে কবরস্থানটি দেখেছ, তার একটি ইতিহাস আছে। ঘটনাটি হলো : একটি ছেলে তার জীবিতকালে নিয়মিত মদ পান, জুয়া খেলা সহ নানান ধরণের অন্যায় কাজ করতো। হঠাৎ একদিন সে মারা যায়। তার মৃত্যুর পর তাকে এই কবরস্থানে দাফন করা হয়। দাফনের পর ঐ দিন রাত থেকেই তার কবরের ভিতর হতে আগুণ জ্বলতে দেখা যায়। দুই দিনের মত সেই আগুণ প্রকাশ্যে জ্বলে। এই যে দেখ, আগুণের প্রভাবে পাশের এই বাঁশঝাড়টিও বিলুপ্তির পথে। অথচ আগে এখানে অনেক বড় বাঁশঝাড় ছিল। দেখ, দেখ, বিলুপ্ত প্রায় বাঁশঝাড়টির বাঁশের মরা মূল শাখা দেখা যাচ্ছে। তাকিয়ে দেখি - হ্যাঁ তাই তো ! আনিস আবারও মুখ খুললো। এই ঘটনাটি সমাজে বেশ প্রভাব ফেলে। মানুষ প্রচুর ভয় পেয়ে যায়। আমি যে মাদরাসার প্রিন্সিপাল, এটা প্রতিষ্ঠার পিছনে বহু কারণের মধ্যে এটিও একটি। বরং বলতে গেলে প্রতিষ্ঠার কাজটাকে এই ঘটনাটি তরান্বিত করে। ঘটনাটি শুনলাম। অবিশ্বাস করলাম না। এরকম বহু ঘটনা বইয়ে পড়েছি। আজ স্বচক্ষে এমন ঘটনা ঘটার স্থান দেখলাম।
দুপুরে বাড়ি ফিরে এসে গোসল করলাম। আজকে আনিসের মাদরাসার বার্ষিক মাহফিল। এবং সেই সাথে গজল অনুষ্ঠান হবে। এর পূর্ণ প্রস্তুতি সেই সকাল থেকে শুরু হয়েছে। দুপুরের খাবার গ্রহণের পর থেকে আনিসও ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আজকে দুপুরের খাবারে নতুন কিছু আইটেম দেখলাম। সম্পূর্ণ দেশীয় খাবার। কিন্তু আমি এই প্রথম এগুলো দেখেছি। হয়তো এগুলো ময়মনসিংহের আঞ্চলিক শাকসবজি। প্রতিটি অঞ্চলেই নিজস্ব কিছু বিষয় থাকে। এগুলোও হয়তো তেমন। এই মুহূর্তে সেগুলোর নামও মনে নেই। তবে একটা বিষয় খুব মনে আছে। তার নাম "ঝাল"। মানুষ এতো ঝাল খেতে পারে?! আশ্চার্য ! কোন এক মনিষীর আত্মজীবনীতে পড়েছিলাম - ময়মনসিংহের মানুষ প্রচুর ঝাল খায়। কিন্তু প্রচুরের পরিমাণ যে এতো, কল্পনা করি নি। মুখে দেওয়ার পর মনে হয়েছিল মুখটা পুড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে উভয় চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরতে থাকে। আহ ঝাল ! আহ ! বহু কষ্টে পানির উপর চাপ রেখে খাবার খেয়েছি। খাবার শেষে আনিসকে জিজ্ঞাস করলাম - কিরে ভাই, এগুলো কি খাওয়ালি?! খাবার নাকি মরিচ? সে প্রশ্ন শোনে হেসে দেয়। আর বলে - তোদের কারণে ঝাল কমিয়ে দিয়েছে। নয়তো আমরা আরও ঝাল খাই। আমাদের চেয়ে প্রতিবেশীরা আরও বেশি খায়। এটা ময়মনসিংহের বৈশিষ্ট্য। শোনে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। বলিস কি এসব?! ঢাকায় থেকেও তোদের অভ্যাস বদলায় নি?!
বিকেলে এলাকায় ঘুরেফিরে আমার লিখিত সঙ্গীতটির আলোকচিত্র গ্রহণ করলাম। তাওহিদ সঙ্গীতটির সুর দিলো। আমি ও বুরহান পাশাপাশি এমনিতে দুষ্টামি করলাম।
সন্ধার পর থেকে মাহফিল শুরু হয়ে গেলো। আমরা ময়মনসিংহের মাহফিল ঘুরেফিরে দেখলাম। বেশ লাগলো। আনিস ফাঁকে একবার আমাদেরকে ডেকে স্টেজ পরিচালনা করতে বললো। অল্পকিছুক্ষণ পরিচালনা করে ফিরে আসলাম। মাঝে তাওহিদ দুইটা ইসলামি সঙ্গীত পরিবেশন করলো। এতে বেশ সাড়া পড়ে গেলো। মোবাইলের স্ক্রিনে এবং টিভিতে দেখা কলরবের শিল্পী যে এখন তাদের সম্মুখে সরাসরি সঙ্গীত পরিবেশন করছে..
স্টেজ ছেড়ে চলে আসার পর আনিস আমাকে আবারও ডাকলো। মাদরাসার প্রিন্সিপাল হিসাবে সে এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে একটা ভাষণ দিবে বলে চিন্তা করেছে। কি বলবে বা কি করে কথা শুরু করবে ভেবে পাচ্ছে না। পরামর্শ দিতে অনুরোধ করলো। তাকে আলোচনার কয়েকটা টপিক বলে দিলাম। ভুলে যাবার ভয়ে সে টপিকগুলো নোট করে রাখলো। এবং আমার দেয়া টপিকেই সে ভাষণ দিলো। তার ভাষণ শোনে মনে মনে খুব হাসলাম।
আমি অনুষ্ঠানের মাঝে ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। হঠাৎ আসা একটি কলে ভয় পেয়ে জেগে উঠি। কিরে ভাই, কই তুমি? অনুষ্ঠান তো প্রায় শেষ ! তুমি কিছু বলবে না? আমি না করে দিলাম। এই শীতে কম্বল ছাড়তে ভালো লাগছে না। তবু তার জোর তাগিদে স্টেজে আসলাম। তাওহিদ জামিলের গজল পর্ব শুরু হওয়ার আগে দুই-চারটা কথা বললাম। কথাগুলো আগ থেকে গোছানো ছিল বলে বলতে পেরেছি। অন্যথায় এরকম ভরা মজলিসে এভাবে কথা বলা সম্ভব হতো না। মানুষ দেখলেই ভয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে যেতো। যাক বাবা, আমার ইজ্জতও রইলো, আনিসের সম্মানও ঠিক থাকলো !
আমার কথা বলার পর তাওহিদ জামিল ৫ থেকে ৬ টা সংগীত পরিবেশন করলো। নিঝুম রাতের নিরব পরিবেশে শোনতে বেশ লেগেছে। শীতের কনকনে রাতে এমনভাবে সংগীত শোনার সৌভাগ্য আগে কখনও হয় নি, ভবিষ্যতে হবে কিনা সন্ধেহ।
অনুষ্ঠান শেষে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন ১৮/০১/২০১৬ ইং সোমবারের সকালবেলা ফজরের পর এলাকাটি শেষবারের মত ঘুরে দেখে নেই। তারপর নাশতা করে ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। আমরা আনিসের বন্ধু, এই সুবাধে গত দুইদিনে গ্রামে বেশ পরিচিত হয়ে যাই। গতরাতের মাহফিল এবং গজল অনুষ্ঠানের ফলে আরও বেশি পরিচিতি পাই। এই জন্য বিদায় মুহূর্তে অনেকেই এগিয়ে আসে। আবারও আসার দাওয়াত দেয়।
আনিসদের এই এলাকাটি একেবারে অজপাড়া গাঁও। বিদ্যুৎ নেই, লোক সমাজে শিক্ষার হার কম, বাজারে তাদের স্থানীয় পন্যের দাম খুব নিম্ন পর্যায়ের ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মধ্যে আনিসদের পরিবার শহুরে। ফলে বাঘের অভাবে শিয়াল হয়ে যায় রাজা। সে হয়ে উঠে এলাকার একমাত্র উচ্চশিক্ষিত ছেলে। আসলে তার দৌড় কতটুকু, এটা আমরাই জানি। তবে তার এলাকায় তার প্রভাব খুব বেশি পরিমাণে।
বিদায় নিয়ে গফরগাঁও রেলস্টেশনে আসলাম। একটা লোকাল ট্রেন এলো। এতেই উঠে পড়লাম। এই ট্রেনটি জায়গায় জায়গায় স্টেশন করলো। এতে একটা সুবিধা হলো। নতুন কিছু জায়গা ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেলাম। বিশেষ করে গাজীপুর জেলাটির দেখার। অন্য কোন মাধ্যমে হয়তো এতো ভালো করে দেখা সম্ভব হতো না। আমি ঢাকায় ফেরার পথে পুরোটা সময় ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। এতে খুব ভালো লেগেছে ! দরজায় না দাঁড়ালে হয়তো গাজীপুর জেলাটির সৌন্দর্য সম্পর্কে অজানায় থেকে যেতাম। সবুজশ্যামল পাহাড়ি লাল মাটিতে গড়া একটি জেলা। আমার কাছে অনেকটা সুন্দরবনের মত লেগেছে। এই জন্যই হয়তো বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক গাজীপুরে বানিয়েছে।
গাজীপুর জেলার পাহাড়ের কোলঘেঁষে বনবাদাড় পেরিয়ে দুপুর ১২ টায় গাজীপুরের জয়দেবপুর স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। এখানে বিরতি দেওয়ার পর এক মধ্যবয়সী লোক এসে দরজায় দাঁড়ানো আমার সেই জায়গাটি দখল করে নেয়। আমি তখন হালকা দম টানতে দরজা ছেড়ে নিচে নেমেছিলাম। এই ফাঁকে লোকটি এমন কাণ্ড করে। এদিকে পাঁচ মিনিট বিরতি শেষে ট্রেন আবারও ছেড়ে দেয়। এতে আমি বেশ বিপাকে পড়ে যাই। লোকটি দরজা ছাড়ছে না। আমি দরজার হাতল ধরে ঝুলে আছি। যেকোন সময় রাস্তার পাশের গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারি। অথচ লোকটির মাঝে কোন ভাবান্তর নেই। বারেবারে বললাম - ভিতরে গিয়ে আমাকে জায়গা করে দেন। ঝুলে থাকতে পারছি না। লোকটির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। ফলে অনুরোধের সুর ছেড়ে ধমকের আশ্রয় নেই। কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠি - দরজা ছেড়ে আমাকে উঠার জায়গা দিবি, নাকি টান দিয়ে বাইরে ফেলে দেবো? এতে আমিও মরবো, তুইও মরবি। কোনটা করবি? তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নে। ধমকে কাজ হলো। দরজা ছেড়ে উঠার জায়গা করে দিলো। আর আমি ঝুলন্ত থাকা থেকে রেহাই পেলাম। অবশেষে ঢাকার বিমানবন্দর রেলস্টেশনে এসে পৌঁছলাম। এখানে আমি এবং এনাম নেমে গেলাম। বুরহান তেজগাঁও রেলস্টেশনে গিয়ে নামবে।
যাইহোক, আনিস আমাকে এবং বুরহান ও এনামকে বিশেষভাবে বিশেষ ভঙ্গিতে তার অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিলো। সেই সাথে তার গ্রামের বাড়িতে দুই/তিন দিন বেড়ানোর আবদার। ও হ্যাঁ, উক্ত অনুষ্ঠানে কিন্তু আরেক সহপাঠী বন্ধুবর "তাওহিদ জামিলকেও" দাওয়াত দিয়েছে। তবে সে কলবরের শিল্পী হিসাবে গিয়ে অনুষ্ঠান মাতাবে। আমাদের সাথেই তার যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে পরে যায়।
শীতকালের দাওয়াত এটি। শোনেছি উত্তরবঙ্গে প্রচুর শীত পড়ে। যা ঢাকা বা কুমিল্লায় কল্পনা করা যায় না। বাস্তবেও তাই দেখেছি। এজন্য শীত থেকে বাঁচতে সতর্কতা স্বরূপ কিছু বাড়তি গরম পোশাক কিনি। যাত্রার তিন-চার দিন আগ থেকেই প্রস্তুতির পর্ব শুরু করি। শেষ পর্যন্ত যাত্রার দিনটি চলে এলো।
মজার ব্যাপার হলো - অনুষ্ঠানের এই দাওয়াতটি 'বিশ্ব ইজতেমার' ছুটিতে পড়েছে। আমরা প্ল্যান করেছি দুই-একদিন ইজতেমার মাঠে থাকবো। তারপর সেখান থেকেই ট্রেনের মাধ্যমে ময়মনসিংহ যাবো। সিদ্ধান্তক্রমে ইজতেমার মাঠে গিয়ে একদিন থাকলাম। উদ্বোধনীয় বয়ান শুনলাম। ইজতেমার মাঠের সাথে আমার কেমন যেন একটা সম্পর্ক হয়ে গেছে। প্রায় প্রত্যেক বছর একদিনের জন্যও হলেও আসতে হয়। বিগত ছয়/সাত বছর যাবৎ নিয়মিত আসা হচ্ছে। এবারও ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি। এবারের আগমনে অবশ্য বাড়তি একটা প্রাপ্তিও রয়েছে। ইজতেমার মাঠে আগমনের দ্বিতীয় দিন সৌদি আরবের বিখ্যাত মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শায়েখের সাথে একান্তে ২ ঘণ্টা সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে। তাদের আরবীয় আতিথ্যে আমি সিক্ত হয়েছি। ভাঙা ভাঙা আরবিতে তাদের সাথে কথা বলেছি। কোন আরব শায়েখের সাথে এই প্রথম আমার একান্ত আলাপন। এমন সুযোগ পাবো বলে কল্পনা করি নি। কিন্তু হয়ে গেলো। ইজতেমার মাঠে বরুড়া মাদরাসায় অধ্যয়নরত আমার পূর্ব পরিচিত এক ছাত্রের সাথে দেখা হয়। তার মাধ্যমেই মূলত এই সুযোগ পাই। তার খালাতো ভাই বিশ্ব ইজতেমায় আগত বিদেশি মেহমানদের খিদমতে ছিল। আমরা তার সেই খালাতো ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাই। আর এতেই...
ইজতেমার মাঠে দিনটি কাটিয়ে রাতে কাফরুলে অবস্থিত মামার বাসায় এলাম। বুরহান এবং এনাম তখনও মাঠে থেকে যায়। মাঠ থেকে তারা সরাসরি বিমানবন্দর রেলস্টেশনে আসবে। তারপর একসাথে রেলে করে ময়মনসিংহ যাবো।
ইজতেমার মাঠ থেকে এসে পরের দিনটা বাসায় কাটালাম। রাতে ময়মনসিংহ যাওয়া নিয়ে আমার লেখা সঙ্গীতটি পুনঃসম্পাদনা করলাম। কলবরের শিল্পী বন্ধুবর তাওহিদ এটা ময়মনসিংহ গিয়ে গাইবে। তবে তা স্টেইজে গাইবে না। ক্যামেরার সামনে। আমরা তিনজন তাতে ক্যামেরাবন্দী হবো। স্টেইজে না গাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো - এটি একটি বিনোদনপূর্ণ সঙ্গীত। এর কথা ও সুর মাহফিলের স্টেইজে মানানসই হবে না। তাছাড়া এতে ময়মনসিংহ জেলার বৈশিষ্ট্য নিয়ে ঠাট্টা করেছি। আনিস বিষয়টা জানে। ঢাকায় থাকতে লেখাটি তাকে দেখিয়েছি। সেও বিষয়টা নিয়ে বেশ মজা করেছে। যদিও তার পৈতৃকভূমি নিয়ে ঠাট্টা।
পরদিন ১৬ই জানুয়ারি ২০১৬ ইং শনিবার। আমি ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে পৌঁছলাম। কিন্তু তাদের দু'জনের দেখা নেই। অথচ প্ল্যান ছিল সকাল ৯ টার ট্রেনই আমরা ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে চলতে থাকবো। তাদের হলোটা কি? এখন ৯ টা গড়িয়ে সাড়ে নয়টা ছুঁইছুঁই। কল দিলাম। বলছে - এই তো এসে গেছি।
সকাল ১০ টার সময় তাদের আগমন ঘটে। দেখেই খুব বিরক্তি প্রকাশ করলাম। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি। যার প্রতিটি সেকেন্ড এক একটি ঘণ্টা মনে হয়েছে। "অপেক্ষা মৃত্যুর চেয়েও কঠিন" প্রবাদটি তখন সত্যিই মনে হয়েছে। যাক, এখন তো এসেছে ! যদি আরও দেরি করতো !
বিমানবান্দর রেলস্টেশনে প্রবেশ করলাম। টিকেট কাটতে কাউন্টারে গেলাম। নাহ, তাৎক্ষণিকের কোন টিকেট নেই। আনিসকে উপায় জিজ্ঞাস করলাম। সে বললো - ঢাকা শহরে যেভাবে বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাও, এভাবে ট্রেনে দাঁড়িয়ে চলে এসো। দুই ঘণ্টা লাগবে। তবে ঢাকা ভিতর দাঁড়িয়ে বাস চড়তে যতটা বিরক্ত লাগে, ট্রেনে দাঁড়িয়ে ততোটাই মজা পাবে। টিকেট চেক করার সময় টিটির হাতে কিছু ধরিয়ে দিলেই হবে। কোন সমস্যা হবে না। উৎসাহ পেয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করলাম। সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে কমলাপুর থেকে ময়মনসিংহগামী ট্রেন এলো। আমরা তাতে উঠে গেলাম।
ট্রেন ঢাকা ছেড়ে ময়মনসিংহের দিকে চলতে থাকে। আনিসকে সংবাদটা জানালাম। সে বললো - ময়মনসিংহ শহরে যাওয়ার দরকার নেই। তার আগের স্টেশন গফরগাঁও নেমে যাবে। সেখান থেকে অটো বা সিএনজি যোগে বাড়ি চলে আসবে। স্টেশনে এসে কল দিও। বাকী পথটা আসার প্রদ্ধতি তখন বলে দেবো।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রেনের ভ্রমণ মন্দ লাগে নি। নতুন কয়েকটি অভিজ্ঞতা অর্জন হলো। এটিই আমার প্রথম ট্রেনে দূরপাল্লার সফর। ট্রেনে অবশ্য ইতোমধ্যে কয়েকবার চড়া হয়েছে। তা শুধু ঢাকার ভেতরেই। ঢাকার বাইরে এই প্রথম দূরে কোথাও ট্রেনে যাচ্ছি। এক বগি থেকে হেঁটে আরেক বগি ; এভাবে ভালোই মজা হলো। অবশেষে দুপুর দুইটা কিংবা আড়াইটার সময় গফরগাঁও স্টেশনে এসে নামি।
আনিসকে কল করে পরবর্তী উপায় জিজ্ঞাস করলাম। সে গফরগাঁও স্টেশনের কাছ থেকে রিকশা নিয়ে দেওয়ানগঞ্জ বাজার, সেখান থেকে অটো বা সিএনজি দিয়ে রাজাবাড়িয়া বাজারে আসতে বললো। আমরা তাই করলাম। আসার পথে ব্রহ্মপুত্র নদীর দেখা পেলাম। নদীটির উপর অনেক সুন্দর একটি ব্রিজ। ব্রিজটি দেখতে বেশ লাগলো। তবে নদীর দিকে তাকিয়ে খুব খারাপ লেগেছে। এক সময়ের দাপুটে নদী এখন মৃতপ্রায়। ব্রিজের প্রয়োজন মনে হলো আর কয়েকবছর পর লাগবে না।
রাজাবাড়িয়া বাজারে এসে আনিসের দুই ভাগ্নের দেখা পেলাম। ওরা আনিসের তত্ত্বাবধানে আমাদের লালামাটিয়া মাদরাসায় পড়ে। এই সুবাধে তারা পূর্বপরিচিত। ফলে আনিসকে পুনরায় বিরক্ত না করে ভাগ্নেদ্বয়ের সাথে বাড়ি চলে আসলাম। আনিসের বৃদ্ধ বাবার সাথে দেখা হলো। প্রথমে চিনতেই পারি নি। শহুরে মানুষ হিসাবে একটু গোছালো টাইপের হবে ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু এ দেখি পুরো গ্রাম্য কৃষকের ভাব। আনিসকে এর কারণ জিজ্ঞাস করাতে বলে - তার বাবা তার ছোটবেলার পুরনো অভ্যাস এই জীবনে বখনও ছাড়তে পারে নি। যদিও ঢাকায় চাকরিবাকরি করেছে এবং উত্তরায় বাড়ি করে থেকেও গেছে।
দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিলাম। মাগরিবের আগ মুহূর্তে হাঁটতে বের হলাম। হাড় কাঁপানো শীতের কথা অনেক শুনেছি। কখনও সরাসরি উপলব্ধি করি নি। করার সুযোগও হয় নি। কুমিল্লা বা ঢাকার শীত চামড়ার উপরেই শেষ হয়ে যায়। হাড়ে পৌঁছার সুযোগ পায় না। এখানে এসে ডবল পোশাক পরেও হাড়ে শীতের উপস্থিতি টের পাই। কুয়াশার প্রচুরতায় নিজের হাতটিও অচেনা মনে হয়। রাত যত বাড়ছে, শীতের আক্রমণ ততো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এমন শীতের মুখোমুখি এই প্রথম।
অনেকক্ষণ হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে রাজাবাড়িয়া বাজারে এলাম। একটা চায়ের দোকানে ঢুকলাম। চায়ের অর্ডার দিলাম। চা চলে এলো। ধূমায়িত গরম চা। প্রচণ্ড শীতের মাঝে একটুখানি গরমের পরশ। আহ, কি শান্তি ! মজা করে এক কাপ খেলাম। আনিস বললো - এখানে চায়ের দাম কাপ প্রতি এক টাকা বা দুই টাকা করে। যত পারো খাও। এরকম সস্তা দামে এমন ভালো দুধ চা আর কোথাও পাবে না। হ্যাঁ তাইতো ; এমনটা আর কোথায় পাবো?! এখানে নাকি গরুর খাঁটি দুধের দাম কেজি প্রতি ৩০/৩৫ টাকা করে। এতো সস্তা ! আমরা চান্স পেয়ে পাঁচ-ছয় কাপ চা এবং এক গ্লাস করে দুধ খাই। এতে দোকানিকে দেখি ভিন্ন চোখে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। এভাবে তাকানোর রহস্য বুঝতে পারলাম না। সস্তা দামে ভালো জিনিস পেলে কি আর কেউ ছাড়ে !
চা খেয়ে বাইরে থাকা আর সম্ভব হলো না। বাড়ি ফিরে আসলাম। দরজা আটকে শীতের আক্রমণ থেকে বাঁচতে চেষ্টা করলাম। হুম, অনেকটা সফল হলাম। কম্বল গায়ে দিয়ে বসতেই বেশ আরামবোধ হলো। এদিকে বন্ধুবর তাওহিদ জামিল করলো আরেক কাহিনী। সে আসার কথা ছিল আগামীকাল। এখন কল দিয়ে বলছে - আমি নরসিংদী থেকে রওয়ানা দিয়ে অনেকটা পথ চলে এসেছি। বাকী পথের গাড়ি পাচ্ছি না। আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাও। তাওহিদের কল পেয়ে আনিস পড়লো মহাবিপদে। এই শীতের রাতে তাওহিদকে এগিয়ে আনবে কিভাবে? গাড়ি পাবে কোথায়?! কয়েক জায়গায় কল দিয়ে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত বহু কষ্ট করে বেচারা একটি মোটর সাইকেল সংগ্রহ করে। এবং তাওহিদকে এগিয়ে নিয়ে আসে।
শীত দেখে রাতের বেলা বাইরে বের হওয়ার আর তেমন সাহস পেলাম না। তবু বাধ্য হয়ে একবার বের হয়েছি। বের হতেই একঝাঁক কুয়াশা এসে আমাকে ঝাপটে ধরে। কাঁপতে কাঁপতে বেহাল হয়ে পড়ি। মনে হলো তুষার পড়ছে। অথচ আমি জানি বাংলাদেশে তুষার পড়ে না। ভাবলাম - তুষার যে সব দেশে পড়ে, তাদের জানি কি অবস্থা ! আল্লাহ, সবাই তুমি ঠাণ্ডার খারাপ প্রভাব থেকে রক্ষা করো। আমিন।
তুষারসম এই কুয়াশার ঝাপটা থেকে বাঁচতে ঘরে ফিরছিলাম - হঠাৎ দেখি একটা কুকুর দরজায় বসে আছে। কুকুর দেখে ভয় পেয়ে যাই। আমি একটু কুকুর ভীতু টাইপের মানুষ। কুকুরকে সিরিয়াস ভয় করি। ফলে দরজার দিকে আগাতে ভয় পাচ্ছিলাম। দূর থেকে আনিস বিষয়টি লক্ষ্য করে। তাই এগিয়ে এসে অভয় দেখায়। বলে - এটা শিকারি কুকুর। কিচ্ছু করবে না। রাতে এটা আমাদের বাড়ি পাহারা দেয়। কাছ আস। দেখবে - দিনের বেলা আমার সাথে তোমাকে দেখার কারণে কিভাবে লেজ নেড়ে স্বাগত জানায়। সত্যিই লেজ নেড়ে স্বাগত জানালো।
রাতে খাবার খেয়ে শোয়ে পড়ি। পরদিন ১৭/০১/২০১৬ ইং রবিবার। ভোরবেলা নাশতা করে প্রাতঃভ্রমণে বের হলাম। আশেপাশের দুইটা গ্রাম ঘুরে দেখলাম। নতুন জায়গা ; যা দেখি তাই ভালো লাগে। এই প্রাতঃভ্রমণের এক জায়গায় এসে আনিস বললো - এখানে যে কবরস্থানটি দেখেছ, তার একটি ইতিহাস আছে। ঘটনাটি হলো : একটি ছেলে তার জীবিতকালে নিয়মিত মদ পান, জুয়া খেলা সহ নানান ধরণের অন্যায় কাজ করতো। হঠাৎ একদিন সে মারা যায়। তার মৃত্যুর পর তাকে এই কবরস্থানে দাফন করা হয়। দাফনের পর ঐ দিন রাত থেকেই তার কবরের ভিতর হতে আগুণ জ্বলতে দেখা যায়। দুই দিনের মত সেই আগুণ প্রকাশ্যে জ্বলে। এই যে দেখ, আগুণের প্রভাবে পাশের এই বাঁশঝাড়টিও বিলুপ্তির পথে। অথচ আগে এখানে অনেক বড় বাঁশঝাড় ছিল। দেখ, দেখ, বিলুপ্ত প্রায় বাঁশঝাড়টির বাঁশের মরা মূল শাখা দেখা যাচ্ছে। তাকিয়ে দেখি - হ্যাঁ তাই তো ! আনিস আবারও মুখ খুললো। এই ঘটনাটি সমাজে বেশ প্রভাব ফেলে। মানুষ প্রচুর ভয় পেয়ে যায়। আমি যে মাদরাসার প্রিন্সিপাল, এটা প্রতিষ্ঠার পিছনে বহু কারণের মধ্যে এটিও একটি। বরং বলতে গেলে প্রতিষ্ঠার কাজটাকে এই ঘটনাটি তরান্বিত করে। ঘটনাটি শুনলাম। অবিশ্বাস করলাম না। এরকম বহু ঘটনা বইয়ে পড়েছি। আজ স্বচক্ষে এমন ঘটনা ঘটার স্থান দেখলাম।
দুপুরে বাড়ি ফিরে এসে গোসল করলাম। আজকে আনিসের মাদরাসার বার্ষিক মাহফিল। এবং সেই সাথে গজল অনুষ্ঠান হবে। এর পূর্ণ প্রস্তুতি সেই সকাল থেকে শুরু হয়েছে। দুপুরের খাবার গ্রহণের পর থেকে আনিসও ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আজকে দুপুরের খাবারে নতুন কিছু আইটেম দেখলাম। সম্পূর্ণ দেশীয় খাবার। কিন্তু আমি এই প্রথম এগুলো দেখেছি। হয়তো এগুলো ময়মনসিংহের আঞ্চলিক শাকসবজি। প্রতিটি অঞ্চলেই নিজস্ব কিছু বিষয় থাকে। এগুলোও হয়তো তেমন। এই মুহূর্তে সেগুলোর নামও মনে নেই। তবে একটা বিষয় খুব মনে আছে। তার নাম "ঝাল"। মানুষ এতো ঝাল খেতে পারে?! আশ্চার্য ! কোন এক মনিষীর আত্মজীবনীতে পড়েছিলাম - ময়মনসিংহের মানুষ প্রচুর ঝাল খায়। কিন্তু প্রচুরের পরিমাণ যে এতো, কল্পনা করি নি। মুখে দেওয়ার পর মনে হয়েছিল মুখটা পুড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে উভয় চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরতে থাকে। আহ ঝাল ! আহ ! বহু কষ্টে পানির উপর চাপ রেখে খাবার খেয়েছি। খাবার শেষে আনিসকে জিজ্ঞাস করলাম - কিরে ভাই, এগুলো কি খাওয়ালি?! খাবার নাকি মরিচ? সে প্রশ্ন শোনে হেসে দেয়। আর বলে - তোদের কারণে ঝাল কমিয়ে দিয়েছে। নয়তো আমরা আরও ঝাল খাই। আমাদের চেয়ে প্রতিবেশীরা আরও বেশি খায়। এটা ময়মনসিংহের বৈশিষ্ট্য। শোনে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। বলিস কি এসব?! ঢাকায় থেকেও তোদের অভ্যাস বদলায় নি?!
বিকেলে এলাকায় ঘুরেফিরে আমার লিখিত সঙ্গীতটির আলোকচিত্র গ্রহণ করলাম। তাওহিদ সঙ্গীতটির সুর দিলো। আমি ও বুরহান পাশাপাশি এমনিতে দুষ্টামি করলাম।
সন্ধার পর থেকে মাহফিল শুরু হয়ে গেলো। আমরা ময়মনসিংহের মাহফিল ঘুরেফিরে দেখলাম। বেশ লাগলো। আনিস ফাঁকে একবার আমাদেরকে ডেকে স্টেজ পরিচালনা করতে বললো। অল্পকিছুক্ষণ পরিচালনা করে ফিরে আসলাম। মাঝে তাওহিদ দুইটা ইসলামি সঙ্গীত পরিবেশন করলো। এতে বেশ সাড়া পড়ে গেলো। মোবাইলের স্ক্রিনে এবং টিভিতে দেখা কলরবের শিল্পী যে এখন তাদের সম্মুখে সরাসরি সঙ্গীত পরিবেশন করছে..
স্টেজ ছেড়ে চলে আসার পর আনিস আমাকে আবারও ডাকলো। মাদরাসার প্রিন্সিপাল হিসাবে সে এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে একটা ভাষণ দিবে বলে চিন্তা করেছে। কি বলবে বা কি করে কথা শুরু করবে ভেবে পাচ্ছে না। পরামর্শ দিতে অনুরোধ করলো। তাকে আলোচনার কয়েকটা টপিক বলে দিলাম। ভুলে যাবার ভয়ে সে টপিকগুলো নোট করে রাখলো। এবং আমার দেয়া টপিকেই সে ভাষণ দিলো। তার ভাষণ শোনে মনে মনে খুব হাসলাম।
আমি অনুষ্ঠানের মাঝে ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। হঠাৎ আসা একটি কলে ভয় পেয়ে জেগে উঠি। কিরে ভাই, কই তুমি? অনুষ্ঠান তো প্রায় শেষ ! তুমি কিছু বলবে না? আমি না করে দিলাম। এই শীতে কম্বল ছাড়তে ভালো লাগছে না। তবু তার জোর তাগিদে স্টেজে আসলাম। তাওহিদ জামিলের গজল পর্ব শুরু হওয়ার আগে দুই-চারটা কথা বললাম। কথাগুলো আগ থেকে গোছানো ছিল বলে বলতে পেরেছি। অন্যথায় এরকম ভরা মজলিসে এভাবে কথা বলা সম্ভব হতো না। মানুষ দেখলেই ভয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে যেতো। যাক বাবা, আমার ইজ্জতও রইলো, আনিসের সম্মানও ঠিক থাকলো !
আমার কথা বলার পর তাওহিদ জামিল ৫ থেকে ৬ টা সংগীত পরিবেশন করলো। নিঝুম রাতের নিরব পরিবেশে শোনতে বেশ লেগেছে। শীতের কনকনে রাতে এমনভাবে সংগীত শোনার সৌভাগ্য আগে কখনও হয় নি, ভবিষ্যতে হবে কিনা সন্ধেহ।
অনুষ্ঠান শেষে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন ১৮/০১/২০১৬ ইং সোমবারের সকালবেলা ফজরের পর এলাকাটি শেষবারের মত ঘুরে দেখে নেই। তারপর নাশতা করে ঢাকার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। আমরা আনিসের বন্ধু, এই সুবাধে গত দুইদিনে গ্রামে বেশ পরিচিত হয়ে যাই। গতরাতের মাহফিল এবং গজল অনুষ্ঠানের ফলে আরও বেশি পরিচিতি পাই। এই জন্য বিদায় মুহূর্তে অনেকেই এগিয়ে আসে। আবারও আসার দাওয়াত দেয়।
আনিসদের এই এলাকাটি একেবারে অজপাড়া গাঁও। বিদ্যুৎ নেই, লোক সমাজে শিক্ষার হার কম, বাজারে তাদের স্থানীয় পন্যের দাম খুব নিম্ন পর্যায়ের ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মধ্যে আনিসদের পরিবার শহুরে। ফলে বাঘের অভাবে শিয়াল হয়ে যায় রাজা। সে হয়ে উঠে এলাকার একমাত্র উচ্চশিক্ষিত ছেলে। আসলে তার দৌড় কতটুকু, এটা আমরাই জানি। তবে তার এলাকায় তার প্রভাব খুব বেশি পরিমাণে।
বিদায় নিয়ে গফরগাঁও রেলস্টেশনে আসলাম। একটা লোকাল ট্রেন এলো। এতেই উঠে পড়লাম। এই ট্রেনটি জায়গায় জায়গায় স্টেশন করলো। এতে একটা সুবিধা হলো। নতুন কিছু জায়গা ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেলাম। বিশেষ করে গাজীপুর জেলাটির দেখার। অন্য কোন মাধ্যমে হয়তো এতো ভালো করে দেখা সম্ভব হতো না। আমি ঢাকায় ফেরার পথে পুরোটা সময় ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। এতে খুব ভালো লেগেছে ! দরজায় না দাঁড়ালে হয়তো গাজীপুর জেলাটির সৌন্দর্য সম্পর্কে অজানায় থেকে যেতাম। সবুজশ্যামল পাহাড়ি লাল মাটিতে গড়া একটি জেলা। আমার কাছে অনেকটা সুন্দরবনের মত লেগেছে। এই জন্যই হয়তো বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক গাজীপুরে বানিয়েছে।
গাজীপুর জেলার পাহাড়ের কোলঘেঁষে বনবাদাড় পেরিয়ে দুপুর ১২ টায় গাজীপুরের জয়দেবপুর স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। এখানে বিরতি দেওয়ার পর এক মধ্যবয়সী লোক এসে দরজায় দাঁড়ানো আমার সেই জায়গাটি দখল করে নেয়। আমি তখন হালকা দম টানতে দরজা ছেড়ে নিচে নেমেছিলাম। এই ফাঁকে লোকটি এমন কাণ্ড করে। এদিকে পাঁচ মিনিট বিরতি শেষে ট্রেন আবারও ছেড়ে দেয়। এতে আমি বেশ বিপাকে পড়ে যাই। লোকটি দরজা ছাড়ছে না। আমি দরজার হাতল ধরে ঝুলে আছি। যেকোন সময় রাস্তার পাশের গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারি। অথচ লোকটির মাঝে কোন ভাবান্তর নেই। বারেবারে বললাম - ভিতরে গিয়ে আমাকে জায়গা করে দেন। ঝুলে থাকতে পারছি না। লোকটির সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। ফলে অনুরোধের সুর ছেড়ে ধমকের আশ্রয় নেই। কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠি - দরজা ছেড়ে আমাকে উঠার জায়গা দিবি, নাকি টান দিয়ে বাইরে ফেলে দেবো? এতে আমিও মরবো, তুইও মরবি। কোনটা করবি? তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নে। ধমকে কাজ হলো। দরজা ছেড়ে উঠার জায়গা করে দিলো। আর আমি ঝুলন্ত থাকা থেকে রেহাই পেলাম। অবশেষে ঢাকার বিমানবন্দর রেলস্টেশনে এসে পৌঁছলাম। এখানে আমি এবং এনাম নেমে গেলাম। বুরহান তেজগাঁও রেলস্টেশনে গিয়ে নামবে।



No comments:
Post a Comment
Note: Only a member of this blog may post a comment.