Breaking

Tuesday, December 4, 2018

সাত রঙের চা খেতে [ ৫ম পর্ব ]

আজকের মত শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ এখানেই শেষ। শ্রীমঙ্গলে আরও অনেক জায়গা রয়ে গেছে। সেগুলো ভবিষ্যতে কখনও সুযোগ হলে আবারও এসে দেখবো । বিশেষ করে হামহাম ঝর্ণা দেখার জন্য হলেও আসবো। চা এর রাজ্য হে শ্রীমঙ্গল, তোমার বুক থেকে এবার বিদায় নিচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, আবারও দেখা হবে।

চান্দের গাড়ি ছেড়ে দিলো। শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে এসে আমাদের নামিয়ে দিলো। গত মধ্যরাতে এখানে এসেছিলাম বেড়ানোর জন্য ; এখন এসেছি বিদায় নিতে। হায়রে জীবন !

এখন বিকাল সাড়ে ৪ টা বাজে। স্টেশনের টিকেট কাউন্টারে গিয়ে সিলেটগামী ট্রেনের তথ্য নিলাম। সন্ধা ৬ টার আগে কোন ট্রেন নেই। এখন কি করা যায় - করণীয় ঠিক করতে মতবিনিময় করলাম। আজকের এই দিনে আমাদের অন্যতম সফরসঙ্গী, যাদের সাথে গাড়ি শেয়ার করে শ্রীমঙ্গল দেখেছি, ঢাকার ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির সেই ৫ জন ছাত্র - তারা বাসের মাধ্যমে সিলেট শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এবং সে উদ্দেশ্যে রেলস্টেশন থেকে রিকশা নিয়ে বাসস্টেন্ডের দিকে চলে যায়। আমরা তিনজন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি আরও কতক্ষণ। এখন আমরা শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত রাশেদের দাদার বাড়ি গিয়ে থাকবো? নাকি সিলেট শহরে চলে যাবো? বহু হিসাব নিকাশের পর সিলেট চলে যাবারই সিদ্ধান্ত নেই। এর কারণ - শ্রীমঙ্গল থেকে সিলেট শহরের দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার। আর এতোদূর পাড়ি দিয়ে পরদিন রাতারগুল, বিছানাকান্দি ঘুরতে যাওয়া সম্ভব হবে না। কেননা রাতারগুল আর বিছানাকান্দির মাঝেও কয়েকঘণ্টা পথের দূরত্ব। সিলেট ভ্রমণে এই এক সমস্যা - এক পর্যটনকেন্দ্র থেকে আরেক পর্যটনকেন্দ্রের দূরত্ব অনেক বেশি। গাড়ি চড়তে চড়তে হয়রান হয়ে যেতে হয়। সব মিলিয়ে রাতটা সিলেট শহরে থাকাই ভালো।

এসেছিলাম শ্রীমঙ্গলে রাশেদের দাদার বাড়িতে থাকাকে কেন্দ্র করে। ভাগ্যের গতি এখন অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শুরুতেই বলেছি - এবারের এই সফরটির মাঝে কাকতালীয় অনেক বিষয় রয়েছে। কোনরূপ কল্পনা ছাড়া সেগুলোর মুখোমুখি আমরা হয়েছি। শ্রীমঙ্গলে রাত না কাটিয়ে সিলেট শহরে চলে যাওয়ার বিষয়টিও তেমন। সন্ধা ৬ টার আগে যেহেতুু শ্রীমঙ্গল থেকে সিলেট যাওয়ার কোন ট্রেন নেই ; তাই ট্রেন বাদ দিয়ে বাসে যাবার সিদ্ধান্ত নেই। এবং রেলস্টেশন ছেড়ে বাসস্টেন্ডের দিকে হাঁটা দেই। পথিমধ্যে আবারও আজকে সারাদিন যে গাইডম্যান আমাদেরকে পথ দেখিয়ে শ্রীমঙ্গল দেখিয়েছিল, তার সাথে দেখা। সিলেট চলে যাচ্ছি শোনে লোকটি আমাদের সাথে কিছুটা পথ সঙ্গ দেয়। নানান কথা বলে। অবশেষে শ্রীমঙ্গল বাসস্টেন্ডের পথ দেখিয়ে চলে যায়। লোকটি যাবার পর আরেকজনের সাথে ভাব জমে। ছেলেটি সিলেটের স্থানীয়। যাবেও এখন সিলেট। ফলে তার সাথে কথা বলতে বলতে শ্রীমঙ্গল বাসস্টেন্ডে আসি। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। হবিগঞ্জ জেলা শহর থেকে একটি বাস এলো। যাবে সিলেট। আমরা সেটায় উঠে পড়লাম। বাস ছেড়ে দিলো। বিদায় স্মৃতিমধুর একটি দিন। বিদায় শ্রীমঙ্গলের আলো বাতাস।

গত বৃহস্পতিবার রাতে ঘুমিয়েছিলাম। তারপর শুক্রবার দিন গেলো, রাত গেলো। শনিবার দিনের আগমন ঘটলো। তারও এখন শেষ মুহূর্ত। অথচ এতো লম্বা সময়ে আমার ভাগ্যে 'ঘুম' নামক জিনিসটি জোটে নি। এমনিতে আমি একটু বেশিই ঘুমাই। তারমধ্যে ঘুম ছাড়া এতো দীর্ঘ সময় কাটানো সত্যিই আশ্চার্যের। নিজের কাছেই বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। গত রাতে ট্রেনে অর্ধরাত্রি পর্যন্ত নির্ঘুম কাটিয়েছি। বাকী রাত শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে বসে বসে ঘুমের প্রহর গুনেছি। আজকের দিনটি ঘুরেফিরে অতিক্রম করেছি। এতো লম্বা সময় বিশ্রামগ্রহণ ছাড়া কাটিয়ে শরীর অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তবে মনে এখনও জোর আছে। আনন্দভ্রমণ বলে এখনও দিব্যি আছি। তা থেকেও লাভ কি ! শরীর আর কতক্ষণ কথা শোনবে?! ফলে বাস শ্রীমঙ্গল থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিতেই ঘুমিয়ে পড়ি। এই ঘুম 'মৌলভীবাজার' জেলা শহরে এসে ভাঙে।  এখানে বাসে যাত্রী উঠানামা করে। আমরা বসে থাকি। আমাদের গন্তব্য এখনও অনেকদূর !

'মৌলভীবাজার' জেলা শহরটি মোটামুটি বড়ই। বাস থেকে শহরটি পরক্ষ করতে চেষ্টা করি। একটা সময় বাস শহর ছেড়ে সিলেটের সড়কপথে চলে আসে। সেই সাথে আমার চেখেও ঘুমের পুনরাগমন ঘটে। সন্ধা ৭ টার সময় সিলেট শহরে প্রবেশের সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম ঘুম চোখে সিলেট শহর দেখতে থাকি। দক্ষিণ সুরমা, কদমতলী পেরিয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় বাসস্টেন্ডে চলে আসি। বাস থেকে নেমে একটি সিএনজিতে আরোহন করি। উদ্দেশ্য হযরত শাহজালাল রহ. এর দরগাহ যাওয়া। সিএনজি বাসস্টেন্ড ছেড়ে সিলেট রেলস্টেশনের সামনের পথ দিয়ে এগুতে থাকে। মোড় পেরিয়ে একটু এগুতেই রাস্তার মাঝে একটা গেইট দেখতে পাই। দেখতে অনেকটা মাজারের গেটের মত। গেইটের অপর পাশটাও আস্তে করে উপরের দিকে উঠে গেছে। ভাবলাম এটাই বোধ হয় শাহজালাল রহ. এর দরগাহ। কিন্তু না, কাছে আসতেই দেখি গেইটের মধ্যম বরাবর বাঁশ টাঙানো। বড় কোন যানবাহন যাতে ব্রিজের উপর উঠতে না পারে, এই জন্য এমন ব্যবস্থা। আমাদের সিএনজির সামনের সিটে বসা এই শহরের স্থানীয় একজন থেকে জানলাম - এটি সুরমা নদীর উপর তৈরি করা ব্রিজ। সুরমা নদী। আহ সুরমা নদী ! কত কিছু দেখলে তুমি ! তোমার ভাগ্য কত ভালো। আচ্ছা, সুরমা নদীর কথা আমি ঢাকায় ফেরার পথে বলবো। এখন শাহজালাল রহ. এর মাজারে যাই।

সিএনজি ব্রিজ পেরিয়ে বন্দরবাজারে ঢুকলো। বন্দরবাজার পেরিয়ে জিন্দাবাজার। জিন্দাবাজার। কেমন না নামটা? হ্যাঁ, একটি মাযার দেখে নামকরণের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। মাজারটি জিন্দাবাজারের মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। এর পরিচয়পর্বে লেখা - "হযরত শাহজালাল রহ. এর সাথে আসা ৩৬০ জন আউলিয়ার অন্যতম হযরত জিন্দা শাহ রহ. এর মাযার। হুম, এই জিন্দা শাহকে কেন্দ্র করে এই স্থানের নাম জিন্দাবাজার। সিলেট শহরের এই একটি গুণ ভালো। হযরত শাহজালাল রহ. এবং তার সাথে আসা সঙ্গীদেরকে এখানের বাসিন্দারা খুব সম্মান করে। সরকারী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নামে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতে খুব গর্ববোধ করে। এর প্রমাণ শহরে অনেক রয়েছে।

জিন্দাবাজার পেরিয়ে দরগাহ রোডের কাছে আসতেই আরেকটি মাজারের দেখা পাই। এটিও শাহজালাল রহ. এর সঙ্গীদের মধ্যে একজনের মাজার। সঙ্গীটির নাম - জালাল আহমাদ। আমরা জালাল আহমাদের মাজার পেরিয়ে মোড় কেটে হযরত শাহজালাল রহ. এর দরগাহের মূল গেইটে আসি। সিএনজি থেকে নেমে দরগায় প্রবেশ করি। রাতের পরিবেশে দরগাহ চত্ত্বরের পরিবেশ দেখি। গেইট বরাবর চত্বরের অপর পাশে বহুতল মসজিদ। তার ডান পাশে শাহজালাল রহ. এর মাজার। বামপাশে মাদরাসা। মাদরাসাটি অনেক বড়। মসজিদের পাশে ইংরেজি ( L ) অক্ষরের মত করে মাদরাসার একটি বিশাল ভবন। তাছাড়া চত্বরের আরেক পাশে তিনতলা একটি ভবন আছে। এর ছাদে, কার্নিশে প্রচুর কবুতর বসা। কবুতরের এই ভবনটি পেরিয়ে একটু সামনে গেলে একটি বড় কুয়া। কুয়াটি রেলিংয়ে ঘেরা। এই কুয়ায় নাকি অনেক বড় বড় মাছ আছে। আমিও একটি বিশাল মাগুর মাছ দেখেছি। এই কুয়ায় অতিভক্ত লোকজন মান্নত করে মাছগুলোকে খাবার দেয়। যাকে বলে অতি পাগলামি। এই পাগলামি পুকুরের পশ্চিম পাড়ে একটু আগে বর্ণিত মাদরাসাটির আরও দুইটি ভবন রয়েছে। মাদরাসা ভবনের সামনে দিয়ে একটি রাস্তা। রাস্তার অপর পাশে বিশাল কবরস্থান। এই কবরস্থানটি শাহজালাল রহ. এর মাজারের পাশাপাশি। মাদরাসা এবং কবরস্থানটির মাঝ দিয়ে যে রাস্তাটি গেছে তার কিছুদূরে দো'তলা বিশিষ্ট দুইটি ঘর। রাত ১০ টার সময় একবার এদিকে এসেছিলাম। তখন সে ঘর দু'টির দ্বিতীয় তলা থেকে পাগলদের মারেফতি গানের আওয়াজ পেয়েছিলাম।

ভালো লাগার বিষয় হলো - এখানে তারা গান গাইলেও মূল মাজারে সে সুযোগ নেই। আমার দেখা মাজারগুলোর মধ্যে তুলনামূলক শাহজালাল রহ. এর মাজারই একটু বেশি গর্হিতকাজ মুক্ত। এখানে মাজারের কাছে মহিলাদের যাওয়া নিষেধ,  ছবি তোলা নিষেধ। এখানে কাউকে কবরকে সিজদা করতে দেখি নি। এছাড়া মাজারের পাশে ছোট্ট করে ঘর বানানো। তাতে কুরআন শরীফ রাখা। আমল করার সুন্দর পরিবেশ। তবে হ্যাঁ, মোমবাতি জ্বালানো, মান্নতের গোলাপজল ছিটানো, কবরের পাশে কবরকে কেন্দ্র মুনাজাত দেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো এখানেও আছে। তবে পরিমিত। ঢাকায় অনেক মাজার দেখেছি। আমাদের কুমিল্লার আদিনামুড়া মাজারও দেখেছি। ঐগুলোতে যতটা ব্যাপক শিরিকী কাজ চলে, এখানে সে তুলনায় খুবই কম। ভালো লাগার মত আরও কিছু বিষয় আছে। তাছাড়া অন্যান্য মাজারগুলোতে কবরে শায়িত ব্যক্তি নিয়ে আমি সন্ধিহান। এখানে শোয়া ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব নিয়ে কোন সন্ধেহ রাখি না। নিঃসন্ধেহে তিনি আল্লাহর খাঁটি বান্দা। তাঁর কথা আমি ফেরার পথে সুরমা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বলবো।

আমরা দরগায় এসে প্রথমে পুকুরের পাশে অবস্থিত মাদরাসা ভবনটিতে গেলাম। একজন বৃদ্ধ খাদেম আমাদের খোশ আমদেদ জানালেন। আমাদের পরিচয় নিলেন। পড়ালেখার বিষয়টি শোনলেন। হাসিমুখে দাওয়াতও দিলেন। মাদরাসাটি দেশব্যাপী অনেক প্রসিদ্ধ। প্রত্যেক বছর ভালো ফলাফল করে। মূলত মাদরাসাটির কারণেই মাজারটি অনেক নিয়ন্ত্রিত। এখানে একটা কথা বলি। তা হলো - মাজার জিয়ারতকারী অধিকাংশই দূরদূরান্ত থেকে আগত। তাই চাইলেও তাদেরকে শিরিকী কাজ থেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না। তবে কিছু মানুষ আছে, তাদেরকে দেখেছি এই বিষয়ে খুব তাকাদা দিতে। অবশ্য ইসলামিক প্রশাসন থাকলে সব সম্ভব হতো।

যাক, মাদরাসায় এসে নিজেদেরকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করি। তারপর শাহজালাল রহ. এর মাজারের কাছে যাই।  জিয়ারতের দোয়া পড়ে ফয়েজ ও বরকত নেই। সুন্নত অনুযায়ী কবর জিয়ারত করে চলে আসি। এমন সময় এশার আযান দেয়। তাই মসজিদে চলে আসি। অত্যন্ত একাগ্রতার সাথে নামায পড়ি। মুসল্লিরাও খুব আগ্রহের সাথে এশার নামায পড়ে।

রাত বাজে নয়টা। খাবার খাওয়া দরকার। সে উদ্দেশ্যে দরগাহ ত্যাগ করে দরগার কাছের একটি রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করি। এবং নৈশভোজ সম্পন্ন করে আবারও দরগায় ফিরে আসি। দরগার চত্বরে বসে পরদিনের ট্যুর প্ল্যান নিয়ে কিছুটা সময় ব্যায় করি। তারপর ঘুমের জন্য প্রস্তুতি নেই। দুই দিনের ঘুম জমে আছে।

আমরা দরগার পাশে অবস্থিত আরেকটি মসজিদের এক ইমাম সাহেবের সহযোগিতায় কম দামি হোটেলের সন্ধান পেলাম। রিকশা যোগে আমরা সিলেট শহরের 'লালবাজার' আসলাম। একটি হোটেলে ডবল বেডের রুম বুকিং দিলাম। তারপর রুমে এসে দুই খাট এক সাথে মিলিয়ে ক্লান্ত শরীর বিছানায় ছেড়ে দিলাম। রাত সাড়ে এগারোটার সময় দু'চোখে ঘুম এসে হামলে পড়ে। আমরা গভীর নিদ্রার অতলে হারিয়ে যাই।

♥ [ বাকী অংশ পরবর্তী পর্বে দেখুন ] ♥

No comments:

Post a Comment

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Adbox