Breaking

Thursday, January 24, 2019

অনুশোচনা


চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে 'তাহমিদ' দুইমাস যাবৎ দুরারোগ্যে ভুগছে। দিনদিন শুকিয়ে কেমন যেন কাঠ হয়ে যাচ্ছে। খাওয়া দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। ফলে দুর্বলতায় একেবারে কাবু হয়ে গেছে। উন্নতির কোন লক্ষণ নেই। চেয়ারম্যান সাহেব দেশের প্রায় সব বড় বড় ডাক্তার কবিরাজের কাছে ছেলেকে নিয়ে গেছেন। সবাই চিকিৎসার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করে। তাদের কেউ তাহমিদের সঠিক কোন রোগ ধরতে পারছে না। চিকিৎসা তো পরের বিষয়। অবশেষে চেয়ারম্যান সাহেব নিরাশ হয়ে যান। শেষ ভরসা হিসাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে ছেলের সুস্থতার জন্য কেঁদে কেঁদে দোয়া করেন। তাহমিদ তাঁর একমাত্র সন্তান। সে যদি হারিয়ে যায়, তাহলে তার বংশধারা কে রক্ষা করবে?!  ভাবতে বসলে কেমন যেন শিহরিত হয়ে উঠেন।

***

চেয়ারম্যানের বাড়িতে দোয়ার অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে। উক্ত অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজন পাড়াপড়শি ও আশেপাশের কয়েক গ্রামের হত-দরিদ্র লোকদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য এক বেলা খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। আমন্ত্রিত প্রায় সব মেহমান অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছে। ব্যতিক্রম শুধু চেয়ারম্যান সাহেবের বড় ভাইয়ের পরিবার। তাদের কেউ এতে অংশ নেয় নি। কিন্তু কেন?

***

পূর্ণিমার চাঁদনি-রাত। জোছনা ভরা আকাশ। কখনও কখনও দক্ষিণ প্রান্ত থেকে বয়ে আসছে মন জুড়ানো হিমেল বাতাস। এমনই শান্ত পরিবেশে গ্রামগঞ্জের লোকেরা ঢলে পড়ে ঘুমের আবেশে। একটি লোকের চোখে তখনও ঘুম নেই। লোকটির প্রিয় মুহূর্তগুলোর মধ্যে এটিও একটি। এমন মুহূর্তে মাছ ধরতে তাঁর খুব ভালো লাগে। ছোট বেলা থেকেই তাঁর এই নেশা। এমন একটি মুহূর্তের জন্য তিনি প্রায় সময় মুখিয়ে থাকেন। লোকটি আর কেউ নন, রূপগঞ্জের চেয়ারম্যান 'রমিজ মিয়া'। তিনি বসে আছেন মধ্যরাতের আশায়। চাঁদ যখন তার পূর্ণ যৌবন নিয়ে জোছনা ছড়াবে, তখন তিনি বের হবেন।

মধ্যরাত। চাঁদ এখন মাথা বরাবর। পুরো পৃথিবী আলোর চাদরে ঢেকে আছে। চেয়ারম্যান সাহেব হাতে একটি ছোট্ট টর্চলাইট, একটি কোঁচ ও একটি ব্যাগ নিয়ে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে বের হলেন। ছোট ছোট পা ফেলে মন্থর গতিতে এগুতে থাকেন। গন্তব্য তার সে প্রিয় হ্যাচারি - যা ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়ে ও সৌন্দর্যের সমাহারে অতুলনীয়। হ্যাচারিটির চার পাশের পাড় হরেক রকম সারিবদ্ধ ফল গাছের বেষ্টনে বেষ্টিত। সারাক্ষণ যা পাখিদের কিচিরমিচির শব্দের মুখরিত হয়ে থাকে। এমন একটি স্বপ্নিল হ্যাচারির বর্তমান মালিক তিনি।

চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে ঐ হ্যাচারিটি পর্যন্ত যেতে হলে প্রথমে দুইটা ফসলি খেত পড়ে। তার আইল দিয়ে হেঁটে হেঁটে ওখানে যেতে হয়। এখন অবশ্য আইলটি আগের মত সরু-চিকন নেই। চেয়ারম্যানের প্রভাবে অনেকটা মোটা ও উঁচু হয়ে গেছে। সেই যাইহোক, চেয়ারম্যান রমিজ মিয়া তাঁর বাড়ির দক্ষিণের পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে হ্যাচারির দিকে এগুতে লাগলেন। চলতে চলতে ফসলি খেত দু'টোর কাছে চলে আসলেন। তারপর চতুর্দিকে একবার নজর বুলালেন। আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে আবারও হাঁটা ধরলেন। মনের সুখে বিড়বিড় করে গান গাইতে লাগলেন। নিস্তব্ধ পরিবেশে তাঁর এমন রসহীন কর্কশ গলার গান শোনে অদূরে থাকা একটা তাল থেকে দুইটি পেঁচা পাখা ঝাপটে শব্দ করে তাঁরই উপর দিয়ে চলে যায়। হঠাৎ পেঁচার শব্দ শোনে চেয়ারম্যান রমিজ মিয়া থমকে দাঁড়ান। মুখের উপর আটকে যায় তাঁর গান। যাত্রার শুরুতে পেঁচার শব্দ শোনে ভয় পেয়ে যান । তাহলে কি কপালে আজ কোন দুঃখ আছে?

পরক্ষণে নিজেকে সামলে নেন রমিজ মিয়া। ভয় কাটিয়ে হেঁটে হেঁটে হ্যাচারির কাছে আসেন। একটা জাম গাছের নিচে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। তারপর টর্চলাইটের ক্ষীণ আলো এবং চাঁদের মনোমুগ্ধকর জোছনার সাহায্য নিয়ে মাছের অবস্থান খোঁজতে থাকেন। একটি ঝোঁপের কাছে এসে শোলমাছ জাতীয় বড় একটি মাছ দেখতে পেলেন। শুরুতেই শোলমাছ পেয়ে চেয়ারম্যান সাহেব মনেমনে খুব খুশি হলেন। তৎক্ষণাৎ কোঁচটি হাতে নিয়ে লক্ষ্য ঠিক করলেন। তারপর দেরি না করে কুপ মারলেন। কোঁচটি ঠিক লক্ষ্যবস্তুতে গিয়ে বিঁধল। কিন্তু দুর্ভাগ্য ; মাছটি তোলার আগেই কোঁচটি হাত ফসকে ছুটে যায়। আর মাছটি বিদ্ধ অবস্থায় কোঁচ নিয়ে মাঝ হ্যাচারির দিকে ছুটতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। রমিজ মিয়া স্বাধের মাছটি এভাবে হাতছাড়া করার মত মানুষ না। তিনি হাতছাড়া হবার আশঙ্কায় তৎক্ষণাৎ হ্যাচারির পানিতে নেমে যান। দ্রুত গিয়ে কোঁচটি ধরে ফেলেন।  এবং শখের মাছটি শিকারের উদ্দেশ্য সে দিকে হাত বাড়ালেন। আর তখনই সেটা রমিজ মিয়ার হাতে ছোবল মারে। শোল মাছ মারে নি। গোখরা সাপে মেরেছে। রাতের অন্ধকারে ক্ষীণ আলোতে দৃষ্টিভ্রম হয়ে গোখরা সাপকে শোল মাছ মনে করেছিলেন রমিজ মিয়া। ছোবলের আঘাতে ব্যাথায় কুকিয়ে উঠে চেয়ারম্যানের দেহ। আর্তচিৎকার দিয়ে উঠেন তিনি। সেই সাথে একদিকে ঢলে পড়েন।

***

রাজিয়া বেগম স্বামীর চিৎকার শোনে চোখ তুলে তাকান। চেয়ে দেখেন তাঁর স্বামী রমিজ মিয়া খাটের নিচে পড়ে আছেন। মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। দৃশ্যটি দেখে রাজিয়া বেগমও ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠেন। আওয়াজ শোনে প্রতিবেশীরা ছুটে আসে। তারা ভেবেছে হয়ত তাহমিদ আর বেঁচে নেই। তাই এমন ভয়ঙ্কর চিৎকার।

প্রতিবেশীরা ছুটে এসে দেখে চেয়ারম্যান সাহেব অজ্ঞান হয়ে ফ্লোরে পড়ে আছেন। তারা চেয়ারম্যান রমিজ মিয়াকে ধরাধরি করে বিছানায় শায়িত করে দেন। ডাক্তার ডেকে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

দীর্ঘ সময় পর চেয়ারম্যান রমিজ মিয়ার জ্ঞান ফিরে। ফাঁকা রুমে তখন তিনি একা শোয়ে আছেন। এমন নির্জন পরিবেশে চেয়ারম্যান সাহেব নিজেকে খুব অসহায় মনে করতে লাগলেন। পুরো অস্তিত্ব জুড়ে অস্থিরতা অনুভব করলেন। তার থেকে পরিত্রাণ পেতে আবারও ঘুমানোর চেষ্টা করলেন। পারলেন না। চোখ বন্ধ করলেই স্বপ্নের সে ভয়ঙ্কর দৃশ্যটি দেখতে পান।

রাত শেষে ভোর হলো। চেয়ারম্যান সাহেব বিছানা ছাড়লেন। খুব একনিষ্ট মনে ফজরের নামায আদায় করলেন। নামায শেষে স্ত্রীকে ডাকলেন। স্ত্রী ছুটে এলেন। স্বামী রমিজ মিয়ার শারীরিক খোঁজখবর নিলেন। রমিজ মিয়া আশ্বস্ত করলেন। স্ত্রীর উৎসুক মন গতরাতের ঘটনাটির তাৎপর্য জানতে চাইলো। স্বামীকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলেন। রমিজ মিয়া মুখ খুললেন না। তিনি পরে জানাবেন।

চেয়ারম্যান রমিজ মিয়ার চিন্তারাজ্যে এখন একটাই বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো - গত রাতে এমন অশুভ স্বপ্ন দেখলেন কেন? কী তার রহস্য? সমাধান পেতে জীবন নামক অধ্যায়ের অতীত পাতাগুলো উল্টাতে লাগলেন। নাহ, তেমন কিছু মনে পড়ছে না। ভাবনায় আবারও গভীর হলেন। হুম, এবার হেতু খুঁজে পেলেন। আর অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন - হ্যাচারিটি তিনি ফিরিয়ে দিবেন। তাঁর জীবনে যত দুর্যোগের আগমন ঘটেছে, সবগুলোর পিছনে রয়েছে এই হ্যাচারির পরক্ষ-হাত। তিনি খুঁজে পেলেন তাহমিদ দুরারোগ্যে আক্রান্ত হওয়ার কারণ। তিনি বুঝতে পারলেন গত রাতের স্বপ্নের ব্যাখ্যা।
তাহমিদ অসুস্থ হওয়া এবং চেয়ারম্যান সাহেব গতরাতে স্বপ্নটি দেখার পিছনে যে রহস্যটি কাজ করেছে বলে ভেবেছেন, তা হলো - মূলত হ্যাচারিটি ছিল তাঁর বড় ভাইয়ের। বড় ভাই যাইনুল হাফিজ অনেক কষ্ট করে হ্যাচারিটি তৈরি করেছিলেন। মাছ চাষ করে সুখের দিনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। অতীতের দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুন দিনের হাতছানি পেতে চেয়েছিলেন । কিন্তু একদিন মাছ বিক্রি করে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। দুর্ঘটনার পর চেয়ারম্যানের ভাতিজা রফিক মিয়া হ্যাচারিটি দেখাশুনা করা আরম্ভ করে । তার আয় দিয়ে সংসার মোটামুটি ভালোই চলছিল তখন।

এদিকে হ্যাচারিটি চেয়ারম্যান রমিজ মিয়ার মনে ধরে যায়। তার প্রতি লোভ পেয়ে বসে। তাই ছলেবলে কৌশলে এবং ক্ষমতার জোর খাটিয়ে হ্যাচারিটি ছিনিয়ে নেন। সেইদিন চেয়ারম্যানের পায়ে ধরে তাঁর ভাবী ও ভাতিজা খুব কেঁদেছিল। তাদের একমাত্র আয়ের উৎস এই হ্যাচারিটি ফিরিয়ে দিতে কাকুতি-মিনতি  করেছিল। ভাবী, ভাতিজার আকাশ ফাটা কান্না দেখে হয়ত পাথর গলে যেত, কিন্তু চেয়ারম্যানের মনে সামান্য ভাবান্তর ঘটে নি। ফলে নিরাশ হয়ে তারা চলে যায়। আল্লাহর কাছে তার প্রকৃত বিচার ন্যস্ত করে দেয়। সেই সাথে চেয়ারম্যানের সাথে সব ধরণের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তারপর থেকে চেয়ারম্যান রমিজ মিয়া মনের সুখে হ্যাচারিটিতে মাছ চাষ করতে থাকে। সেখানে বসে মনে সুখে গান গেয়ে গেয়ে সময় কাটায়।

আজ ভয়ঙ্কর স্বপ্নটি দেখার পর পুনঃবার সবকিছু মনে পড়ে। ভাবী ও ভাতিজার আহাজারি এবং ক্ষতবিক্ষত মনে তাদের ফরিয়াদ - সবকিছু এই মুহূর্তে স্মৃতিপটে ভেসে উঠে। মনে হতেই চেয়ারম্যান রমিজ মিয়া আপন অস্তিত্বে ভয়ঙ্কর এক কম্পন অনুভব করেন। হুম ; এর কারণেই আজ আমার এই অবস্থা। আমার ছেলে তাহমিদ আজ আমারই পাপের শাস্তি ভোগ করছে। না হয় সামান্য জ্বর থেকে কেন তা দুরারোগ্যে পরিণত হবে ! সেদিন আমি বড় নিষ্ঠুর একটি কাজ করেছি। আমি অপরাধী, আমি পাপী। আমার পাপ আমার পিছন ছাড়ে নি।

চেয়ারম্যান রমিজ মিয়া ভাবী ভাতিজার কথা স্মরণ করে কাঁদতে লাগলেন। সব তাদের বদদোয়ার ফল। আমি আজই তাদের হ্যাচারি তাদেরকে ফিরিয়ে দেবো। দরকার হলে হাত, পা ধরে ক্ষমা চাইবো। পিছনের ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিব। তারপরও তার কোন সমাধান হওয়া চাই। আমার স্বপ্ন আমাকে ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর কোন কিছু হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমি চাই না সে মুহূর্তটি আমার জীবনে আসুক। ভাবী, ভাতিজা ক্ষমা করে দিলে হয়ত আমি সে ভবিষ্যৎ খারাবি থেকে রক্ষা পাবো। তাহমিদ হয়ত সুস্থতার মুখ আবারও দেখতে পাবে। যাই এখনই গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেই।

 শিক্ষা : পাপ কখনও পিছু ছাড়ে না। পাপের শাস্তি আগে হোক বা পরে - ভোগ করতেই হবে। তাই পাপকে ভয় করুন। ভালো কিছু করতে চেষ্টা করুন। এতেই মঙ্গল। 

No comments:

Post a Comment

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Adbox