Breaking

Friday, December 7, 2018

চেতনারা লুকোচুরি খেলে

বিজয়ের মাস আসলে বিজয়ী ভাবনা মনে ঢেউ খেলে। অনেক হিসাব নিকাশ সামনে এসে জমা হয়। আগেই বলে রাখি আমি গণিতে দুর্বল। তবু মাঝেমাঝে হিসাব কষতে বসি। আশায় থাকি ফলাফল মিলাতে পারবো। কিন্তু মিলে না। হয়তো মিলবেও না। বিজয়ের মাস এলে স্বাধীনতা সম্পর্কে যে ভাবনাটা সর্বপ্রথম আমার মনে উদয় হয় ; তা হলো -

স্বাধীনতা। এটি এমন একটি মধুর ধ্বনি, যার প্রতিটি অক্ষরই যেন মধু বর্ষণ করে। স্মরণ করিয়ে দেয় একটি স্বপ্নীল ভূবনের। যেখানে মানবতার জন্য খুশির জোয়ার উঠে। ব্যক্তি তার অধিকার পূর্ণরূপে আস্বাদন করে। মুক্তভাবে জমিনের উপর বিচরণ করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় । থাকে না কোন ভয়ের লেশ মাত্র। সর্বত্র বিরাজ করে ন্যায় ইনসাফের জয়জয়োকার ধ্বনি। এ যেন মুক্তির মহাদূত, জালিমের জন্য মহাপ্রলয়। যা ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয় জুলুম অত্যাচার ও পরাধীনতার শৃংখল। চারদিকে বয়ে বেড়ায় শুধু সুখ আর শান্তির পয়গাম। এটাই স্বাধীনতা। এটাই আমাদের পরম চাওয়া।

গণিতে দুর্বল বলে উপরোক্ত ভাবনার সাথে আমার হিসাব মিলে না। এছাড়া আরও অনেক হিসাব মিলাতে পারি না । বিশেষ করে স্বাধীনতা অর্জনের প্রতি উদ্বোদ্ধকারী প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী অবস্থার  ইতিহাস সম্পর্কে গাণিতিক জটিলতা কাটছে না। আমরা সাধারণত স্বাধীনতার ইতিহাস টানলে ১৯৭১ সালের কথাই বলি। পাকিস্তানিদের জুলুম অত্যাচারসহ তদীয় সংক্রান্ত নানান বিষয়ে আলোচনা করি। আমি ঐগুলো অস্বীকার করছি না। আমার হিসাব না মিলার পিছনে ইতিহাসের কিছু লুকোচুরি বিষয় রয়েছে। যেমন : প্রতিটি স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে একটি চেতনা ও একটি দীর্ঘ ইতিহাস কাজ করে। তার থেকে একটু লুকোচুরি করলে ঐটা স্বাধীনতা রক্ষা নয়, বরং খর্ব করা হয়। বর্তমানে মনে হচ্ছে এটিই বেশি ঘটছে।

স্বাধীনতার আলোচনা আসলে প্রথমে আসে ১৯৭১ সালের কথা। এর ইতিহাস মোটামুটি আমরা সবাই জানি। তবে আমি স্বাধীনতার আলোচনা করলে ১৯৭১ সালে ক্ষ্যান্ত থাকি না। এর মূলে যাই। স্বাধীনতা অর্জনের চেতনার কথা বলি। আরও বলি এর ইতিহাস। সংক্ষেপে এখানে কিছু বলছি -
পৃথক বাংলাদেশ হওয়ার পিছনের ১৯৭১ সালের যেমন ভূমিকা রয়েছে, তারচেয়ে বেশি ভূমিকা রয়েছে ১৯৪৭ সালের। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত না হলে পৃথক বাংলাদেশ হতো না ; এটা হলফ করে বলতে পারি। এখন ১৯৪৭ সালের কথা আসলে বলতে হয় ইংরেজ শাসনের কথা। আর ইংরেজ আগমনের পূর্বে আমরা নবাবদের শাসনে স্বাধীনই ছিলাম। ইংরেজ আসলো। মুসলিম শাসকদের হাত থেকে উপমহাদেশ দখল করে নিলো। উপমহাদেশে তাদের আগ্রাসী শাসন শুরু করলো। ইংরেজদের এমন অত্যাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আওয়াজ তুললেন শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী। এর আগে কেউ মুখ ফুটিয়ে স্বাধীনতার আওয়াজ তুলেন নি। তার এই প্রতিবাদী আহবানের উপর ভিত্তি করেই মূলত পরবর্তীতে সব ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন হয়েছে।

ইংরেজ বিরোধিতায় যাদের সবচেয়ে রক্ত ও ঘাম ঝরেছে - ইতিহাস তালাশ করলে মুসলিস সম্প্রদায়ের কথাই তখন শীর্ষে আসে। আমি এখানে হিন্দুদের অবদান অস্বীকার করছি না। বলছি অধিকাংশ অবদানের কথা। মুসলিম চেতনা সব সময় স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। এ ব্যাপারে হিন্দুদের মাঝে কিছুটা ঘাটতি ছিল। এই বিষয়ে ইতিহাস অনেক কথা বলেছে। স্বল্প পরিসর বলে কথাগুলো ছেড়ে দিতে হচ্ছে।

এখন আসি পৃথক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। এখানেও মুসলিম চেতনাকে প্রাধান্য দিতে হচ্ছে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের কথাই বলি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় - বাংলাভাষীদের পৃথক দেশ গড়ার প্রস্তাবনা উঠলে হিন্দুরা এর খুব বিরোধিতা করে। রবীন্দ্র দর্শনও এর বিপক্ষে নানান কথা বলে। যার ফলে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির সময় বাংলাভাষী অধিকাংশ হিন্দু ভারতের অংশে থেকে যায়। বাংলাভাষী হয়ে পৃথক স্বাধীন দেশে যুক্ত হয় নি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা লাভ করলো। পৃথক বাংলাদেশ গড়ার পথযাত্রাও এর মাধ্যমে শুরু হলো। পাকিস্তানিদের জুলুম অত্যাচার এক সময় বাংলাদেশ গড়াকে তরান্বিত করে দিলো।

বাংলাদেশের স্থপতি বলা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি আওয়ামী লীগের নেতা হিসাবে পরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি যে দলের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেছিলেন, সেই দলটির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আর এই মাওলানা ভাসানীই সর্বপ্রথম ১৯৫৭ সালে "কাগমারী সম্মেলনে" পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আওয়াজ তুলেন। প্রতিষ্ঠালগ্নে তার দলটির নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ।  এখানেও বলতে হয় - পৃথক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পিছনে মুসলিম চেতনার ভূমিকা বেশি ছিল। সেই সাথে আবারও বলছি অন্যদের অবদানও কম ছিল না। আমি শুধু লুকোচুরির অংশগুলো তুলে ধরছি।

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান বেশ ছিল। তবে তারা পাকিস্তানিদের চেয়ে কোন অংশে কম জুলুম করে নি বা করছে না। স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করে দেশে ফিরে যাবার সময় তারা বাংলাদেশ থেকে যত অস্ত্র হাতিয়ে নিয়ে যায় ; মাওলানা ভাসানী বলেন - তৎকালীন সময়ে এর বাজার মূল্য ছিল ১২০ কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য ধনসম্পদ তো আছেই। তাই বলে আমি ভারতের অবদানকে অস্বীকার করছি না। আবার তাদের অপরাধগুলোও ভুলবো না। পাকিস্তান বিষয়েও ঐ একই কথা।

আলোচনার ইতি টানতে চাচ্ছি। স্বাধীনতা অর্জন আমাদের বড় প্রাপ্তি। এর পিছনে যাদের অবদান রয়েছে তাদের অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে। অন্যান্য ইতিহাসের মত লুকিয়ে রাখা ইতিহাসগুলোও সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়া স্বাধীনতার প্রকৃত উদ্দেশ্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে না। স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে যে সব চেতনা কাজ করেছিল, ঐগুলোকে সম্মান করতে হবে। সবার অধিকার নিজ নিজ অবস্থানে থেকে নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীনতার নামে অন্যায় কিছু করা যাবে না। বিজয়ের মাসে এই প্রতিজ্ঞাগুলো আবারও আমাদের স্মরণে আনতে হবে। আমাদের এই বিজয় যেন আমাদের স্বার্থেই ব্যবহার হয়। বহিরাগত কোন শক্তি যেন এতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে ; এদিকে সবার সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বিজয় দিবস হোক প্রকৃত স্বাধীনতার বার্তাবাহী। বিজয় হোক আমাদের দেশের ১৮ কোটি মানুষের।

No comments:

Post a Comment

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Adbox