এমনটা এবারই প্রথম। দুপুরে হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া আর রাতে রওয়ানা হয়ে যাওয়া। সেই সাথে অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরও কিছু নতুন তথ্য যুক্ত করা। যা আমার কাছে বেশ লেগেছে। মনে হচ্ছে - বারংবার যদি এমন মুহূর্ত ফিরে আসতো !
৩১/১০/২০১৮ ইং বুধবার। দুপুরে সিদ্ধান্ত হয় আজ রাতেই সীতাকুণ্ড যাবো। ক্লাস এখন খুবই ঢিলেঢালা চলছে। সবাই প্রধানমন্ত্রীকে সংবার্ধনা দেওয়া অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত প্রায়। এমন সুযোগ আর আসবে না। সুতরাং কাজে লাগিয়ে দেই। তাছাড়া এটি হবে সর্বনিম্ন খরচের সফর। ইতোপূর্বে যে ক'টা সফর করেছি ; হিসাব করে দেখলাম এটিতে খরচ হবে তার এক চতুর্থাংশ কিংবা এক তৃতীয়াংশ। এমনিতে ছাত্র মানুষ বলে কম খরচ হয়। তার উপর আরও..
সন্ধার আগ মুহূর্তে আমরা চারজন (আমি, মামুন, আবদুর রহমান, মিরাজ) ফরিদাবাদ থেকে রওয়ানা হলাম। প্রথমে গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশনের কাছাকাছি একজনের বাসায় গেলাম। সন্ধা ৭ টা পর্যন্ত এখানে ছিলাম।তারপর গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশনে এসে টিকেট কেটে ট্রেন যোগে কমলাপুর আসলাম। আজকে গেণ্ডারিয়া থেকে কমলাপুর আসতে সর্বোচ্চ সাত বা আট মিনিট লেগেছে। অথচ বাস কিংবা অন্যান্য যানবাহনে যেতে আধা ঘণ্টার নিচে কল্পনা করা যায় না ।
কমলাপুর রেলস্টেশনে এসে চট্টগ্রামের টিকেট কাটলাম। 'চট্টগ্রাম মেইল এক্সপ্রেস' ট্রেনের টিকেট। লোকাল জাতীয় ট্রেন এটি। তবে অন্যান্য লোকালের মত এতো বেশি লোকাল না। এখন এটা ছাড়া উপায়ও নেই। ভালো ট্রেনের টিকেট আগ থেকেই কাটা লাগে। আমরা দুপুরে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে রাতে রওয়ানা হয়ে গেছি। এখন এই ট্রেনই ভরসা। বাসে যেতেও ভালো লাগছে না। সড়কপথের জ্যাম অনেক সময় অতিষ্ঠ করে ফেলে। সব মিলিয়ে ট্রেনে যেতেই মজা।
সীতাকুণ্ডের টিকেট কেটে নৈশভোজন করে নিলাম। তারপর স্টেশনের প্লাটফরমে এসে হেঁটে-বসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। আমাদের ট্রেন কমলাপুর থেকে রাত সাড়ে ১০ টার সময় ছাড়বে। আমরা তার দুই ঘণ্টা আগে চলে এসেছি। প্ল্যান করেছি, মেইল এক্সপ্রেসে করেই যেতে হবে। আর মেইল এক্সপ্রেসে যে আগে আসে, সে সিট পায়। অন্যথায় দাঁড়িয়ে যাওয়া লাগে। এজন্য আমাদের বাড়তি সতর্কতা।
রাত ১০ টার আগ মুহূর্তে ট্রেন প্লাটফরমে আসলো। আসতেই একটি বগিতে উঠে ছয়টি আসন দখল করে নিলাম। আজকের ট্যুরে আমরা মূলত চারজন সদস্য। আমি, মামুন, আবদুর রহমান আর মিরাজ। বাড়তি দুই সিট ইমতিয়াজ ও তার সঙ্গীর জন্য। তারা দুইজনও আমাদের ক্লাসমেট। তবে এই প্রথম পরিচয়। এক ক্লাসে হাজার পড়ার এই সুফল। সারা বছরে সবার মুখদর্শনেরও সৌভাগ্য হয় না। পরিচয় তো দূরের কথা। তবু ভালো ; আজ তাদের সাথে পরিচয় হলো। মামুন আগ থেকেই তাদের চিনে। যার ফলে তাদের জন্য দুইটি আসন রাখা। তারা নাকি চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। ওখানে এডমিশ নেয়ার ইচ্ছা আছে তাদের।
রাত সাড়ে ১০ টার সময় কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে দেয়। ট্রেন তখন লোকে লোকারণ্য। দাঁড়িয়ে আছে অনেক লোক। লোকাল ট্রেন বলে কথা। ট্রেন কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে আসলো। এখানে অনেক যাত্রী উঠানামা করলো। তারপর আবারও ছেড়ে দিলো। এর মাঝে একটি মজার ঘটনা ঘটলো। আমি এই প্রথম এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। ঘটনাটি হলো -
পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। ঘটনাটি হলো -
অনেক লোকের মত একটি লোকও আমার সিটের পাশে দাঁড়ানো ছিল। একবার কোন এক প্রয়োজনে আমি আমার আসন ছেড়ে ট্রেনের তাকে রাখা আমার ব্যাগটি দেখতে দাঁড়ালাম। এই সুযোগে লোকটি আমার আসনে বসে পড়ে। তার কাণ্ড দেখে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এটা কি হলো ! বহু কষ্টে নিজেকে সামলে বেচারাকে আমার আসনের শেষ প্রান্তে একটু জায়গা দিলাম। সে বসে রইলো। বাংলাভাষায় একটা প্রবাদ আছে - "বসতে দিলে শোইতে চায় ; শোইতে দিলে খেতে"। লোকটিও তেমন আচরণ শুরু করে দিলো। কিছুক্ষণ যেতেই সে বলে একটু চেপে বসুন। আমি বসতে পারছি না। কথাটা শোনে আরও হতভম্ব হলাম। কি বলে এই লোক?! বসতে দিয়েছি এটাই তো অনেক। এখন দেখছি আমাকেও আসন ছেড়ে দিতে হবে। ফলে আমি চেপে বসতে অস্বীকার করি। বসার জন্য যতটুকু জায়গা দিয়েছি ততোটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকতে বলি। লোকটি শেষ পর্যন্ত সৌজন্যতা রক্ষা করে নি। বল প্রয়োগ করে আস্তে আস্তে চাপতে শুরু করে। ব্যাপারটা সীমা ছাড়িয়ে যেতে লাগলো। ফলে রেগে যাই। চাপাচাপি বন্ধ করতে বলি। লোকটি আমার কথা শোনে বিশ্রী ভাষায় গালাগাল শুরু করে। তার খারাপ ব্যবহার দেখে আমি দমে যাই। সফরসঙ্গী বাকী ৫ জন লোকটিকে কিছুই বললো না। ফলে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু ঘটনার কিছু অংশ যে এখনও বাকী রয়েছে এটা জানতাম না। কিছুক্ষণ পর সেটাই ঘটলো।
আমার সীটের একাংশ দখল করে বসা লোকটি অপর পাশের আরেকজন যাত্রীর সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিল। ঐ যাত্রী টঙ্গী রেলস্টেশনে নেমে যাবে। যাত্রীটি নেমে গেলে লোকটি তার আসনে বসবে। মজার ব্যাপার হলো - শেষ পর্যন্ত সে আর কোন আসনেই বসতে পারে নি। আমার আসনে তো নাই, চুক্তিবদ্ধ আসনটিও হারালো।
ঘটনাটি এভাবে ঘটলো ~ আমার এক সফরসঙ্গী "ইমতিয়াজ"। সে অনেকক্ষণ ধরে লোকটির কর্মকাণ্ড দেখছিল। কিছুই বলছিল না। এবার সে মুখ খুললো। লোকটিকে লক্ষ্য করে বললো : আপনি এই সীটে এভাবেই বসে থেকে যাবেন। চুক্তিবদ্ধ সীটে বসতে পারবেন না। ঐ সীটে দাঁড়ানো লোকদের থেকে যে কোন একজন বসবে। ইমতিয়াজের কথা শোনে লোকটি খুব চটে যায়। গলা উঁচু করে ধমকধমকি শুরু করে দেয়। নীতি নৈতিকতার অনেক কথা বলে। এতে ইমতিয়াজের মাথা গরম হয়ে যায়। উচ্চস্বরে সেও ঝগড়া শুরু করে দেয়। লোকটি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে বকাবকি শুরু করে। আরে, দোষ করলি তুই ; শিক্ষার প্রসঙ্গ টানছিস আমাদের। এতে বাকী ৫ জনের মাথায় আগুণ ধরে যায়। একজোটে সবাই মিলে তাকে ধরি। অপরাধ করছে কে? তুই না আমরা? যা ; আমার এই সীটেও বসতে পারবি না। ঐ চুক্তিবদ্ধ সীটে তো নাই। টঙ্গী স্টেশন আসলে দাঁড়ানো লোকদের থেকে যে কোন একজন বসবে। উঠ। সীট ছেড়ে দাঁড়া। লোকটি আমাদের ধমক খেয়ে পাগলপ্রলাপ শুরু করে দেয়। তার পক্ষে দুই একজন সুর তুলতে চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। ফলে সে উভয় সীট হারায়।
সীট হারিয়ে লোকটি আমাদের উপর নতুন করে ভীতি ছড়াতে চেষ্টা করে। বলে - নরসিংদী আসিস ; পায়ের গোড়ালি কেটে দেবো। তার এই নতুন কথাটি শোনে ইমতিয়াজ হেসে উত্তর দেয় : একটু পর তো নরসিংদীর উপর দিয়েই যাবো। দেখি তুই কি করতে পারছ। তোর যদি কিছু করার ক্ষমতাই থাকতো, তাহলে এখনই প্রয়োগ করতি। ছোট বাচ্চাদের মত বকবক করতি না। পাতি সন্ত্রাসী কোথাকার ! যা.. যা.. এদিক থেকে দূরে যা।
লোকটি বকবক করতে করতে চলে গেলো। টঙ্গী স্টেশনে আসার পর ঐ চুক্তিবদ্ধ লোকটি তার স্ত্রী সহ নেমে গেলো। ফলে দাঁড়ানো লোকদের থেকে দুইজনের আসন ব্যবস্থা হলো । যে দুইটি আসনের ব্যবস্থা হলো, তাতে তিনজন বসলো। মূলত তারা তিনজন একসাথে সীতাকুণ্ড ভ্রমণে বেরিয়েছে। এর মধ্যে দুইটি আসন এখন তাদের ভাগ্যে জুটলো। ফলে কষ্ট করে দুই সীটে তিনজন বসে পড়লো। তাদের এই সুন্দর ব্যবস্থাপনার পিছনে আমাদের অবদান অনেক ছিল বলে তারা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিল। আর তা এইভাবে যে, ভৈরব স্টেশনে ট্রেন বিরতি দেয়ার পর আমাদের জন্য তারা হালকা নাশতার ব্যবস্থা করে। এই আরেক অভিজ্ঞতা। এদের সাথে সীতাকুণ্ড আসা পর্যন্ত সময়টিতে এক ধরণের সম্পর্কও তৈরি হয়ে গেলো।
রাত ১২ টা ১৩ মিনিটের সময় ট্রেন নরসিংদী রেলস্টেশনে এসে পৌঁছায়। ঝগড়া করা ঐ লোকটি এখানে নেমে যায়। নামার সময় তার চেহারা দেখে মায়া হলো। আহ, কত নিরহ একটি প্রাণী ! তার এলাকা দিয়ে যাবার সময় সে আমাদের পায়ের গোড়ালি কেটে দিবে। কি হলো ভাই?! এখন ট্রেন থেকে নামার সময় যে তোমার পায়ের গোড়ালির অবস্থাই খারাপ। বেচারা কোন 'টু' শব্দ না করে নেমে গেলো। অবশ্য নামার সময় আমাদের উপরের রাগ অন্যান্য লোকদের উপর ঝারে। কর্কশ গলায় গলায় নামতে থাকা লোকদের বলে - ট্রেন থেকে নামতে এতো সময় লাগে নাকি?! রাস্তা ছাড়েন।
ট্রেন চলতে থাকে। ভৈরব, আশুগঞ্জ স্টেশন পার হয়ে সামনে বাড়তে থাকে। বি-বাড়িয়া চলে আসে। আখাউড়া রেলওয়ে জংশন পার হয়ে যায়। এই পথটুকু পর্যন্ত জাগ্রত ছিলাম। তারপর সীতাকুণ্ড ভ্রমণের এই যাত্রাপথে ঘুমানোর চেষ্টায় লেগে গেলাম। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে মনে হচ্ছিল আজকের এই রাতটিতেও ঘুম হবে না। আসলে হতোও না। অনেক কায়দাকানুন নিজের উপর প্রয়োগ করে দুই ঘণ্টার মত সময় তন্দ্রায় ব্যস্ত থাকি। এর মাঝে কুমিল্লা জেলা পার করে ফেলি । ফজরের সময় ফেণী এসে তন্দ্রাভাবটি চলে যায়। তারপর থেকে আর তন্দ্রা, ঘুম কোনটাই আসে নি। তবু ভালো ; এবারের ট্যুরে সামান্য হলেও তন্দ্রা ঘুম হয়েছে। অতীত রেকর্ড ভেঙ্গেছে।
ফেণী স্টেশন থেকে ট্রেন সামনে বাড়তে থাকে। শিশির ভেজা ভোরে কুয়াশা ঢাকা পথপ্রান্ত পেরিয়ে অবশেষে সকাল ৬ টা ৪৮ মিনিটে সীতাকুণ্ড রেলস্টেশনে এসে পৌঁছে। আমরা এখানে নেমে যাই।
[ বাকী অংশ পরবর্তী পর্বে ]



No comments:
Post a Comment
Note: Only a member of this blog may post a comment.