Breaking

Wednesday, January 9, 2019

যুদ্ধক্ষেত্রে নারী

নারী। মানবধারার অতুলনীয় মমতার এক কেন্দ্রবিন্দু। আবার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর একটি অধ্যায়ও। যারা খুব সহজে মায়া-মমতার সর্বোচ্চ প্রদর্শনী করতে পারে ; সেই তারাই আবার পৃথিবী ধ্বংসের কাজ নির্দ্বিধায় করে থাকে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বিনির্মাণে যেমন তাদের অবদান অনস্বীকার্য ; ধ্বংস করার ক্ষেত্রেও জুড়ি নেই। তবে এই সব কিছুই নারীর মন-মানসিকতার সাথে সম্পৃক্ত। তাই একজন নারী দেখেই সব নারীর উপর কোন বিষয় সম্পৃক্ত করা বোকামি বৈ কিছুই না। সামগ্রিক দিক বিবেচনা করেই কোন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

নারীর মমতার বিষয়টি এক কথায় ১০০-তে ১০০ পাওয়ার উপযোগী। ধ্বংসের বিষয়টিও সমান সমান। এবারের আলোচনাটি মমতা এবং ধ্বংস উভয়টির মধ্যম পর্যায়ের একটি বিষয় নিয়ে । সেটা হলো - যুদ্ধক্ষেত্রে নারীর অবদান। আর যুদ্ধক্ষেত্র মানেই রক্ত নিয়ে খেলা। এখানে মমতা শব্দ বেমানান। আবার পুরোপুরি ধ্বংসও বলা যায় না। কিছু যুদ্ধ আছে, যেগুলো রক্ত ঝরায় জাতি বিনির্মাণের নিমিত্তে। আমি এবার সে বিষয় থেকে কিছু দৃষ্টান্ত আনবো। জাতির জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে নারীর অবদান।

খন্দকের যুদ্ধ চলছে। নবীজি (স.) এবং পুরুষ সাহাবীগণ সবাই কাফেরদের মোকাবেলায় পরিখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আছেন। মদীনা শহরে তখন শুধু নারী সাহাবিগণ রয়েছেন।  পরিখার ওপাড়ে কাফেরদের বিশাল বাহিনী। যে কোন সময় বড় কোন যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। চরম এই মুহূর্তে মদীনা শহর পুরুষ-শূণ্য। এমন সুযোগকে কাজে লাগাতে চায় মদীনার অপর পাশে বসবাসকারী ইয়াহুদী সম্প্রদায়। তারা মক্কার কাফেরদের প্ররোচনায় রাসূল (স.) এর সাথে কৃত মদীনা সনদের চুক্তি লঙ্ঘন করে। এবং পিছন দিক থেকে অতর্কিত হামলা করে মদীনা দখল করে নেওয়ার গোপন আঁতাত করে ফেলে।

ইয়াহুদীরা সিদ্ধান্ত নেয় - একদল আগে গিয়ে মদীনার অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে আসুক ; তারপর তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী অতর্কিত আক্রমণ করা হবে। সেই উদ্দেশ্যে ইয়াহুদীগণ তাদের প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে। পর্যবেক্ষণ করতে আসা ইয়াহুদীদের এই দলটি মদীনা শহরে এসে গোপনে নিজেদের মধ্যে আপন কর্ম সম্পর্কে পুনরায় কিছু কথা বলে। ঘটনাচক্রে তাদের এই কথোপকথন নবীজি (স.)এর ফুফু সাফিয়্যা (রা.) শুনে ফেলেন। তাদের আলোচনা শোনেই তিনি থমকে দাঁড়ান। কিছু একটা ব্যবস্থা করা দরকার বলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

ইয়াহুদীদের প্রতিনিধি দলের প্রত্যেকে একটা সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পর্যবেক্ষণ করার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়ে। তাদের একজন পৃথক হয়ে একটু আগে বেড়ে যায়। এবং অন্ধাকার গলিপথ দিয়ে আগে বাড়তে থাকে। সাফিয়্যা (রা.) তাদের দমাতে দ্রুত লাঠি হাতে নেন। নিজের অবস্থান শক্ত করে আচমকা ঐ ইয়াহুদীর মাথায় আঘাত করেন। অতর্কিত এই হামলায় ইয়াহুদী লোকটি মারা যায়। সাফিয়্যা রা. এখানেই থেমে যান নি। ঐ ইয়াহুদীর মস্তক কেটে পর্যবেক্ষণ করতে আসা ইয়াহুদী দলের দিকে নিক্ষেপ করেন। এতে ইয়াহুদীদের দল ভয় পেয়ে যায়। তারা মনে করে - হায়, আমরা ভেবেছিলাম মদীনা শহরে কোন পুরুষ নেই ; এই সুযোগে শহর দখল করে নেব। এখন দেখি এখানেও অনেক পুরুষ সৈনিক। ফলে সিদ্ধান্ত পাল্টে দ্রুত শহর ছেড়ে চলে যায়। তারা জানতেই পারলো না - একজন নারী আজ তাদের পরাজিত করে দিয়েছে।

নবীজি (স.) এর ফুফু সাফিয়্যা (রা.) এর এমন বীরত্বপূর্ণ অবদানের কারণে খন্দকের যুদ্ধে মদীনা শহর বিরাট একটি ঝড় থেকে রক্ষা পায়। ইয়াহুদীদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। ফলে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করার ইচ্ছা পরিত্যাগ করে।

বায়তুল মোকাদ্দাস পুনরূদ্ধার অভিযানে সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গি (রহ.) এর স্ত্রী রাজিয়া খাতুনের অবদানের কথা না বললেই নয়। যিনি আপন স্বামী সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গি (রহ.) এর মিশনকে অনেকটা তরান্বিত করেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী (রহ.)কেও এই ব্যপারে খুব সহযোগিতা করেন। তিনি বায়তুল মোকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনার্থে নারী-মহলে গিয়ে ভাষণ দিতেন। যাতে করে তারা যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধাহত মুজাহিদদের নার্সিংয়ের কাজ করতে উৎসাহী হয়। এবং আপন আপন স্বামী, সন্তান, ভাই ও পিতাকে মহান এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়।

রাজিয়া খাতুনের এমন প্রচেষ্টার সুফলে বায়তুল মোকাদ্দাস পুনরূদ্ধারের পথ অনেকটা সুগম হয়। সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী (রহ.) এর অভিযান তীব্রতর হয়। সুলতান নুরুদ্দীনের মৃত্যুর পর সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর জন্যও তিনি বেশ সহায়ক হন। এক যুদ্ধে তো সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী (রহ.) বেশ বেকায়দায় পড়ে যান। ঐ সময় রাজিয়া খাতুনের স্বেচ্ছাসেবিকা বাহিনী সুলতানের সহযোদ্ধাদেরকে বিপদ থেকে রক্ষা করে পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম নজির স্থাপন করেন। যদিও সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী নারীদেরকে যুদ্ধের ময়দানে দেখতে অপছন্দ করতেন। এবং রাজিয়া খাতুনের ঐ মহিলা বাহিনীকে পুনরায় দামেস্কে ফেরত পাঠিয়েও দিয়েছিলেন।

অবশেষে দীর্ঘ ৯০ বছর পর ১১৮৭ সালে বায়তুল মোকাদ্দাস পুনরূদ্ধার হয়। এই সময় মহিয়সী নারী রাজিয়া খাতুন বায়তুল মোকাদ্দাসের মিম্বার, যা তার স্বামী সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী (রহ.) নিজ হস্তে খুব যত্ন করে তৈরি করেছিলেন - সেই মিম্বারটি দামেস্ক থেকে খুব কষ্ট স্বীকার করে বায়তুল মোকাদ্দাসে এনে সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর হাতে বুঝিয়ে দেন। মহান সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ূবী খুব আগ্রহভরে ঐ মিম্বারটি বায়তুল মোকাদ্দাসে স্থাপন করেন।

সুলতান নুরুদ্দীন জঙ্গী (রহ.) এর মহিয়সী স্ত্রী রাজিয়া খাতুনের এমন অনেক ঘটনা ইতিহাসের পাতায় ভরপুর রয়েছে।

ইউরোপের খ্রিস্টবিশ্ব মুসলমানদের বিরুদ্ধে ১২৪৯ সালে সপ্তম ধর্মযুদ্ধের ডাক দেয়। মিশরের মহান সুলতান আস-সালিহ তখন অসুস্থ হয়ে শয্যাগত। এবং এরকম নাযুক একটি মুহূর্তে তিনি মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে চলেও যান। কিন্তু তাঁর এই মৃত্যুর ঘটনাটি প্রকাশ হতে দেন নি এক নারী। তিনি চাচ্ছেন না যে, সুলতানের মৃত্যুর সংবাদের কারণে ক্রুসেড মোকাবেলায় কোন বিঘ্নতা ঘটুক। মৃত্যু পরবর্তী সুলতান হওয়া নিয়ে মুসলমানদের মাঝে কোন ভিতরগত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হোক। সেই মহিয়সী নারী হলেন - সুলতান আস-সালিহের স্ত্রী "শাজারাতুদ দূর"। তিনি সুলতানের মৃত্যুর সংবাদ গোপন রেখে স্বাভাবিক দাফন কাফনের কাজ সেরে ফেলেন। প্রাসাদের কাছের মানুষেরা পর্যন্ত এই সংবাদ জানতে পারলো না।

শাজারাতুদ দূর রাষ্ট্রের সব কাজ সুলতানের নামে জারি রাখতে থাকেন। খ্রিস্টানদের অগ্রযাত্রা রুখতে প্রাসাদে কুঠুরিতে বসেই সেনাপতিদের  বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দেওয়া জারি রাখেন। মানচিত্রের সাহায্যে যুদ্ধের কৌশল বলে দিয়ে সুলতানের অভাব বুঝতে দেন নি। ফলে সপ্তম ক্রুসেডের ঐ যুদ্ধে মুসলমানেরা খ্রিস্টানদের প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। খ্রিস্টানদের সেনাপ্রধান ফ্রান্সের বাদশা সম্রাট লুই স্বয়ং যুদ্ধবন্দি হন। এবং মুসলমানেরা বড় একটি দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পায়।

ক্রুসেডের এই যুদ্ধের সেনাপতি রুকনুদ্দীন বাইবার্সের রণকৌশল এবং বিচক্ষণ শাজারাতুদ দূর এর অবদান ছিল অতুলনীয়। যুদ্ধ জয়ের পরই শাজারাতুদ দূর আপন স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ সবাইকে জানিয়ে দেন।

ইতিহাসের পাতায় এরকম অনেক ঘটনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যেগুলো সাক্ষ্যবহন করে যে, একজন নারী চাইলে সব কিছুই করতে পারে। তাই নারীদের হেয়-প্রতিপন্ন করার কোন জো নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে বড় বড় অনেক জয়-পরাজয়ের পিছনে  নারীর হাত রয়েছে বলে জানা যায়। একজন নারীর উৎসাহের কারণে যেমন পৃথিবী জুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়েছিল, তেমনই ধ্বংস হওয়ার ইতিহাসও খুব কম না। মানবধারার এই অধ্যায়টি খুব ঝুঁকিপূর্ণ। উত্তম তরবিয়ত পেলে নারী হিরকখণ্ড, বদের সংস্পর্শে নারী সাপের বিষ-তুল্য। তাই নারীদের তরবিয়তের ব্যপারে যেন কোন প্রকার ত্রুটি না থাকে - এই বিষয়ে সবার লক্ষ্য রাখা উচিৎ।

No comments:

Post a Comment

Note: Only a member of this blog may post a comment.

Adbox