আজ ০১/১১/২০১৮ ইং বৃহস্পতিবার। অপ্রত্যাশিত নতুন এই আনন্দভ্রমণের প্রথম দিন। আমরা দিনের সূচনালগ্নে সীতাকুণ্ডে পৌঁছে প্রথমে হোটেল বুকিং দেই। সীতাকুণ্ড শহরের মূল পয়েন্টে 'সৌদিয়া' নামক একটি হোটেলে ডবল বেডের রুম নেই। ও হ্যাঁ, সীতাকুণ্ড পৌঁছে আমরা দুই ভাগ হয়ে যাই। আগেই বলেছি - সফরে বের হয়েছি মূলত আমরা চারজন। পরবর্তীতে দুইজন যোগ হয়। সীতাকুণ্ড এসে ঐ দুইজন আপন পথে চলে যায়।
সৌদিয়া হোটেলে ব্যাগপত্র রেখে ফ্রেশ হলাম। তারপর সৌদিয়ার রেস্টুরেন্টে এসে নাশতা করে ভ্রমণের প্রথম পর্বে বের হলাম। সীতাকুণ্ড শহর থেকে একটি সিএনজি নিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে আসলাম। এখন থেকে আমাদের হাঁটার মিশন শুরু। পাদদেশ থেকে চারজনের জন্য চারটা লাঠি নিলাম। এই পাহাড় ভ্রমণে এগুলোর বড় প্রয়োজন। এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের মধ্যে একটি। পাহাড়টির সর্বোচ্চ চূড়ায় একটি মন্দির আছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য এটি একটি তীর্থস্থান। হিন্দুরা আজগুবি যত কাহিনী করে, আমার মনে হয় না অন্য ধর্মাবলম্বীরা এতোটা করে। এই চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণের পুরোটা সময় তাই মনে হলো।
লাঠির উপর ভর করে, কাঁচা সড়ক ও মাঝেমাঝে থাকা সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকলাম। পাহাড়ে উঠার সূচনাপথ থেকেই হিন্দুদের নানান দেবতাঘরের দেখা পাই। এই উঠার পথেই এক জায়গায় এক হিন্দুকে দেখলাম দূরের একটি মন্দিরের দিকে তাকিয়ে বকবক করতে। তার কাছে আসতেই শুনি সে আমাদের নামে তার দেবতার কাছে নালিশ করছে। আমাদেরকে যাতে তার দেবতা উচিৎ শিক্ষা দেয় ; তার জন্য তার মিনতি ! আমরা তার প্রার্থনা শোনে হাসি দিয়ে সামনে বাড়তে থাকি। দেখি তার দেবতা আমাদের কি করে..
প্রায় এক ঘণ্টা লাগাতার পাহাড় বেয়ে চন্দ্রনাথেরর একটি ধাপে উঠি। এতে বেশ হাঁপিয়ে যাই। পাহাড় তো আমাদের কুমিল্লায়ও দেখেছি। কুমিল্লার পাহাড়ে আমাদের নিজস্ব জায়গাও আছে। কিন্তু উভয় পাহাড়ে অনেক পার্থক্য। কুমিল্লার পাহাড়কে বলা যায় বাচ্চা, আর এটি প্রাপ্তবয়স্ক। তাই উঠতে গিয়ে হয়রান হয়ে যাই। আশ্চার্যের বিষয় হলো - যে পাহাড়ে উঠতে গিয়ে একজন শক্তিশালী যুবকও হয়রান হয়ে যায়। সে পাহাড়ে একজন মেয়ে আনায়াসে উঠে আসে। আর বলে : মিনি এভারেস্ট জয় করলাম। তার অভিব্যক্তি শুনে এবং স্বাভাবিক আচরণ দেখে বিস্ময়ে 'থ' হয়ে গেলাম। আমাদের চারজনের মধ্যে আমি না হয় দুর্বল, বাকী তিনজন তো শক্তিশালী। তারাও দেখি ক্লান্তিতে ঘাপটি মেরে বসে আছে। আর এই ঢাকা শহুরে মেয়ে দিব্যি হেসে খেলে বেড়াচ্ছে।
প্রথম ধাপে বিশ্রাম নিয়ে পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠার জন্য হাঁটা ধরলাম। বিশ/পঁচিশ পুনরায় হাঁটার পর চূড়ায় পৌঁছলাম। এখানে একটি বিশাল মন্দির। পুরো পথটাতেই ছোটখাটো অনেক মন্দির দেখেছি। তারমধ্যে এটি সবচেয়ে বড়। এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে এখানে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশ্চার্য লাগলো। দেড় ঘণ্টার লাগিয়ে যে পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম, ঐ একটি পাহাড়ের একটি মন্দিরের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় বিদ্যুতের আনা হয়েছে। অথচ দেশে এমন অনেক অঞ্চল আছে, যেখানের বাসিন্দারা বিদ্যুৎ কি জিনিস জানে না। উচিৎ ছিল ঐ সমস্ত অঞ্চলে আগে বিদ্যুৎ পৌঁছানো। লক্ষ টাকা খরচ করে শুধুমাত্র একটি মন্দিরের জন্য দুর্গম এই পাহাড়ে বৈদ্যুতিক লাইন টানার কোন দরকার ছিল না। এখানের যদি বিদ্যুৎ লাগেই - তার জন্য জেনারেটর আছে, সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরকার এমনটা করলো কেন? সারা বছরে মাত্র কয়েকদিন পূজা করে। তার জন্য এই বিশাল ব্যবস্থা.!!!
যাইহোক, আমরা পাহাড়ের এই চূড়ায় মন্দির দেখতে আসি নি। মেঘ ছোঁয়ার জন্য এবং উপর থেকে সীতাকুণ্ড দেখার জন্য এসেছি। আমাদের দুর্ভাগ্য। আমরা আজ মেঘের ছোঁয়া পাই নি। গতকালের পর্যটকেরা নাকি পেয়েছিল। আমরাও যদি ভোরে আসতাম, মেঘের ছোঁয়া পেতাম। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছতে পৌঁছতে আমরা সকাল সাড়ে ১০ টা বাজিয়ে ফেলি। তাছাড়া আজকে রোদের তাপ বেশি। দুই লিটার পানি নিয়ে পাহাড়ে উঠা শুরু করেছিলাম। সবটা শেষ হয়ে আরও প্রয়োজন দেখা দিলো। পাহাড়ের প্রতিটি ছোটছোট ধাপে ফলফলাদি, পানীয় ও কনফেকশনারীর মালামাল নিয়ে স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ী বসে থাকে। তবে পাহাড়ের নিচের তুলনায় এগুলোতে একটু বেশি দাম। অনেক ক্ষেত্রে এর পরিমাণ দ্বিগুণ কিংবা তারচেয়ে বেশিও হতে পারে।
যাইহোক, রোদের কারণে আজ মেঘের ছোঁয়া আমরা পাই নি। ফলে মনটা একটু খারাপ হলো। তবে উপর থেকে সবুজ শ্যামল আমার দেশটাকে নতুন রূপে দেখে অনেক ভালো লেগেছে। রূপের রাণী আমার দেশ এতো সুন্দর ; পাহাড়ের এই চূড়ায় না উঠলে বুঝতাম না। চূড়া থেকে সীতাকুণ্ড শহরকে মায়ের কোলে থাকা সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুর মত লাগলো। সবুজের ফাঁকে মাথা উঁচু করে রাখা সুউচ্চ ভবনগুলো সত্যি খেলনা মনে হলো। আরও একটি দৃষ্টিনন্দন বিষয় হলো - দৃষ্টির শেষ প্রান্তের সমুদ্র। বঙ্গোপসাগরের কথা বলছি। সীতাকুণ্ড শহর থেকে যা মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আর এই বঙ্গোপসাগরের তীরে গিয়ে হঠাৎ করে সবুজের রাজ্য পরাজয় বরণ করে। তারপর থেকে জলরাশির রাজত্ব। উপর থেকে দেখা সীতাকুণ্ড শহর, বঙ্গোপসাগর, সবুজ শ্যামলে ঢাকা আমার দেশ সত্যি মন কেড়ে নিলো। প্রাণভরে এগুলো দেখলাম।
চন্দ্রনাথ পাহাড়ে মনমাতানো দৃশ্যগুলো দেখে অন্যপথে অবতরণের জন্য হাঁটা ধরলাম। লাঠি ভর করে নামতে থাকলাম। ভেবেছিলাম - নামতে অনেক সহজ হবে। এখন দেখছি উঠার চেয়ে কোন অংশে কম কষ্ট হচ্ছে না। খুবই দুর্গম এই পাহাড়ি পথ। উঠানামার সময় সতর্ক থাকতে হয়। রাস্তা থেকে ঘটনাচক্রে একটু ফসকে গেলেই বড় কোন দুর্ঘটনা নিশ্চিত। নামার সময় তাই বাড়তি সতর্ক থাকলাম। তারপরও পা কাঁপতে থাকলো। বহু কষ্টে সিঁড়ি ও কাঁচাপথ বেয়ে নিচে নামলাম। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের এই ভ্রমণে মোট তিন ঘণ্টার মত সময় লেগেছে।
চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে নেমে সিএনজি নিয়ে আবারও সীতাকুণ্ড শহরে আসলাম। হোটেলে এসে পরবর্তী স্পট সম্পর্কে আলোচনায় বসলাম। সিদ্ধান্ত হলো এবারের যাত্রা হবে খৈয়াছড়া ঝর্ণা। বহু ধাপের এই ঝর্ণাকে কেন্দ্র করেই মূলত এবারের এই সীতাকুণ্ড ভ্রমণ। ঝর্ণার সান্নিধ্যে আসার স্বপ্ন বহু বছর ধরে লালন করেছি। সিলেট গিয়ে সে স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিলাম। সিলেট ঘুরা হয়ে গেলো। কিন্তু ঝর্ণার সান্নিধ্যে যাওয়া হলো না । ফলে চট্টগ্রামের বিখ্যাত এই খৈয়াছড়া ঝর্ণা দেখতে আসা।
[ বাকী অংশ পর্ববর্তী পর্বে দেখুন ]
Wednesday, January 9, 2019
জলপ্রপাতের সন্ধানে [ ২য় পর্ব ]
Tags
# ভ্রমণবৃত্তান্ত
About যুবাইর আহমাদ তানঈম
Soratemplates is a blogger resources site is a provider of high quality blogger template with premium looking layout and robust design. The main mission of templatesyard is to provide the best quality blogger templates.
ভ্রমণবৃত্তান্ত
Labels:
ভ্রমণবৃত্তান্ত
Subscribe to:
Post Comments (Atom)



No comments:
Post a Comment
Note: Only a member of this blog may post a comment.